শিরোনাম

যেভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হয়ে ওঠেন কর্নেল ওসমানী

বিবিসি বাংলা
যেভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হয়ে ওঠেন কর্নেল ওসমানী
কর্নেল এম এ জি ওসমানী। ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নির্বিচারে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে চালানো নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সর্বস্তরের মানুষ, যা পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।

শুরুর দিকে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি সেনারা বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও এপ্রিলের শুরুতে তারা সংগঠিত হতে থাকেন। এই সময় গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। সেই বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন বছর আগেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছিলেন সৈন্যদের কাছে ‘পাপা টাইগার’ নামে পরিচিত কর্নেল ওসমানী। এরপর যুক্ত হয়েছিলেন রাজনীতিতে। সেখান থেকে তিনি আবারও সামরিক উর্দির জীবনে ফিরে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠেন।

এম এ জি ওসমানী ১৯১৮ সালে সুনামগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ব্রিটিশ সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে ওসমানীর শৈশব কেটেছে আসাম ও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে।

সেখানেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের স্বনামধন্য আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৩৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

স্নাতক শেষ করার পর তিনি একইসঙ্গে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীর চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেন। উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দেন।

চাকরিতে যোগদানের মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন এবং একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তার নেতৃত্বাধীন ইউনিটকে বার্মা ফ্রন্টে পাঠানো হয়।

যুদ্ধ শেষে ১৯৪৭ সালে তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয়। দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একই পদে যোগ দেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের অতিরিক্ত কমান্ড্যান্ট, জেনারেল স্টাফ অফিসারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং প্রায় এক দশক পাকিস্তান আর্মি হেডকোয়ার্টারে জেনারেল স্টাফ ও মিলিটারি অপারেশনসের ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অবশেষে ১৯৬৭ সালে কর্নেল পদেই তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। যদিও তার সামরিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও উচ্চপদে যাওয়ার যোগ্যতা ছিল, তথাপি বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতির কারণে তিনি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর এম এ জি ওসমানী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। দলটির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানের সামরিক সরকার তাদের ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। বরং ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।

এর প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বর্জন এবং কর প্রদান বন্ধের আহ্বান জানান। ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে তিনি আন্দোলনকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান, যার ফলে সর্বস্তরের মানুষ এতে সম্পৃক্ত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২২ মার্চ ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সামরিক সদস্যদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এম এ জি ওসমানীসহ সাবেক সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রয়োজনে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। সমাবেশ শেষে তারা শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের শপথ নেন। পরে ওসমানীসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে একটি তরবারি উপহার দেন।

অসহযোগ আন্দোলনের সময় ওসমানী গোপনে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। এতে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, কারণ তারা আশঙ্কা করেছিল যে একটি পৃথক সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

২৫ মার্চের গণহত্যার পর পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে বাঙালি সেনা, ইপিআর ও সাধারণ মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

ওসমানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে জিয়াউর রহমান, কে এম সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, এম এ রবসহ দুই ডজনের বেশি সামরিক কর্মকর্তা অংশ নেন। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, মুক্তিযুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবেন ওসমানী।

একইসঙ্গে দেশকে কয়েকটি সামরিক সেক্টরে ভাগ করে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল নির্ধারণ করা হয়, যা পরবর্তীতে ১১টি সেক্টরে সম্প্রসারিত হয়। এছাড়া দ্রুত প্রবাসী সরকার গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা অর্জনের বিষয়েও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তেলিয়াপাড়া বৈঠকের প্রায় এক সপ্তাহ পর ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। এই সরকারে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। পরবর্তীতে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে।

অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এম এ জি ওসমানীকে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।

প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর ওসমানী মুক্তিবাহিনীকে দুই ভাগে ভাগ করেন। একটি হলো নিয়মিত বাহিনী, অপরটি অনিয়মিত বাহিনী। নিয়মিত বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বাঙালি সদস্যরা, যারা প্রথাগত সামরিক কৌশলে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন।

অন্যদিকে, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও বিভিন্ন পেশার সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয় অনিয়মিত বাহিনী বা গণবাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যদের দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নিয়োজিত করা হয়।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হলে এম এ জি ওসমানী জেনারেল পদে উন্নীত হন। ইতিহাসে তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে আছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে, যিনি বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে সুসংগঠিত রূপ দিয়েছিলেন।

/জেএইচ/