শিরোনাম

আর্থিক খাতে অনিয়ম

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি অপসারিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি অপসারিত
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

দেশের পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলামকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিতর্কিত ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার হালদার বা পিকে হালদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক অনিয়মের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বিশেষভাবে পরিচিত।

গতকাল সোমবার (২০ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়, ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩’-এর ১৯ ধারা অনুযায়ী তাকে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কর্মস্থলে ভয়াবহ অনিয়ম ও তথ্য গোপন করে হলফনামা জমা দেওয়ার অভিযোগে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এর আগে, গত ২৫ জানুয়ারি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। ২৮ জানুয়ারি তিনি এর জবাব দিলেও প্রায় তিন মাস পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ব্যাখ্যা সন্তোষজনক নয় বলে মনে করে এবং চূড়ান্ত অপসারণের নির্দেশ দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে যেন অনতিবিলম্বে একজন দক্ষ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তিকে এমডি হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। একইসঙ্গে ডিএফআইএম সার্কুলার অনুযায়ী যোগ্য কোনো কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব প্রদানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি পদটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি শীর্ষ ব্যক্তিরাই তথ্য গোপন বা উচ্চ সুদে কমিশন বা অন্য স্বার্থে ঋণ নেন, তবে সাধারণ আমানতকারীদের সুরক্ষা বলে কিছু থাকে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর অবস্থান প্রশংসনীয়, তবে এটি যেন নিয়মিত তদারকির অংশ হয়।

তিনি আরো বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এমডিকে অপসারণের জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে পরবর্তীতে সাবেক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর অনাপত্তি দেন। ফলে আদেশের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আমানতকারীদের উদ্বেগ

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের একজন সাধারণ আমানতকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের জমানো টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। আমরা চাই প্রতিষ্ঠানের ওপর সুশাসন ফিরুক এবং যারা আমাদের টাকা নয়-ছয় করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।

অপসারণের কারণ

কেন্দ্রিয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এমদাদুল ইসলাম ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে যোগদানের আগে ‘জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড’-এর এমডি ও সিইও হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন একাধিক গুরুতর অনিয়ম করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

খেলাপি ঋণ লুকানো

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি ছাড়াই কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের ৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকার খেলাপি ঋণকে ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। এর ফলে জিএসপি ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার কৃত্রিমভাবে ১৬ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল।

নীতিমালা লঙ্ঘন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার অমান্য করে জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ঋণ পুনর্গঠন এবং করোনা মহামারিকালীন সময়ে ডরিন হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেডের ঋণের ওপর দণ্ড সুদ আরোপ করার মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

হলফনামায় মিথ্যা তথ্য

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি পদ পাওয়ার জন্য তিনি আগের কর্মস্থলের এসব অনিয়মের কথা গোপন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মিথ্যা হলফনামা ও আবেদন জমা দিয়েছিলেন।

বেআইনি বরখাস্ত

বোর্ড সভার কার্যবিবরণী জাল করা এবং এইচআর নীতিমালা লঙ্ঘন করে সিএফওসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।

কারণ দর্শানোর জবাব ‘অসন্তোষজনক’

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৫ জানুয়ারি তাকে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করেছিল। ২৮ জানুয়ারি তিনি এর জবাব দিলেও দীর্ঘ তিন মাস পর্যালোচনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, তার ব্যাখ্যা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বোর্ড সভার কার্যবিবরণী জালিয়াতি এবং ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা লঙ্ঘন করে সিএফওসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করারও অভিযোগ রয়েছে।

শেয়ারবাজারে শীর্ষ দরপতন

এদিকে এমডি অপসারণের খবরে সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) শেয়ার দর পতনের শীর্ষে উঠে আর্থিক খাতের কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেড। ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানির শেয়ার দর আগের দিনের চেয়ে ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমেছে। কোম্পানিটি ৩৭১ বারে ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৬০২ টি শেয়ার লেনদেন করে। যার বাজার মূল্য ৭২ লাখ টাকা।

প্রসঙ্গত, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং একসময় পি কে হালদারের আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে পি কে হালদার বর্তমানে ২২ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বিদেশে পলাতক। প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠনের চেষ্টার মধ্যেই শীর্ষ পর্যায়ে এমন অনিয়ম ও অপসারণের ঘটনা আর্থিক খাতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

/এমআর/