রপ্তানি ভাটায় পোশাক খাতে অস্বস্তি

রপ্তানি ভাটায় পোশাক খাতে অস্বস্তি
মরিয়ম সেঁজুতি

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সেইসঙ্গে রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ধস। এ যেন দেশের অর্থনীতির এক বৈপরীত্যের চিত্র।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান ভিত্তি রপ্তানি খাত। এ খাতে এককভাবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ গুরুত্বপূর্ণ খাতে টানা ধস দেখা যাচ্ছে। গত ৮ মাস ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ ৯ মাসে শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের অধিকাংশ দেশেই রপ্তানি আয় কমেছে। এই বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, জাপান ও ডেনমার্ক।
বাজারভিত্তিক পতনের চিত্র
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্যানুযায়ী, প্রথাগত এবং বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পোশাকের চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। শীর্ষ ১০টি বাজারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রপ্তানির প্রধান বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় কমানোর ফলে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমেছে।
৯ বাজারে ধস: বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব দেশের মধ্যে ৯টি বাজারেই আগের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম স্পেন, যেখানে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে কিছু বাজার দখল করে নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার জার্মানিতে রপ্তানির পতন সবচেয়ে বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশটিতে রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। অর্থমূল্যে এর পরিমাণ ৫৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয় ৩৮০ কোটি ডলার থেকে নেমে ৩২৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পতন হয়েছে ডেনমার্কে ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। আগের ৮০ কোটি ডলার থেকে আয় নেমে এসেছে ৬৯ কোটি ডলারে। ফ্রান্সেও রপ্তানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে আয় দাঁড়িয়েছে ১৪৫ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬৫ কোটি ডলার।
ইপিবির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় বাজারসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, পরিমাণের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পতন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এই সময়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৫৫৯ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৭৪ কোটি ডলার।
দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি বাজার হিসেবে ফ্রান্সের অবস্থান রয়েছে। দেশটিতে একই সময়ে তুলনামূলকভাবে রপ্তানি কমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা এই দেশটিতে ৩৩০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৩৬ কোটি ডলার। এতে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬১ শতাংশ।
কেন নিম্নমুখী প্রবণতা
রপ্তানি কমার পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু কারণকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ইউরোপ ও আমেরিকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ পোশাকের পেছনে খরচ কমিয়ে দিয়েছে। দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া বন্দর জটিলতা ও কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের কারণে সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা মনে করেছিলাম- শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে অনেক অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। এপ্রিল বা মে মাস থেকে ভালো রপ্তানি অর্ডার পাবো। যা আগস্টে রপ্তানি আয়ের হিসেবে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এখন কবে রপ্তানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, তা বলা কঠিন।
তিনি বলেন, একেক বাজারে রপ্তানি কমার পেছনে অভিন্ন কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম- মার্কিন পাল্টা শুল্ক, শুল্কনীতির কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর আক্রমণাত্মক বাণিজ্য কৌশল এবং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রেমিটেন্স বনাম রপ্তানি: অর্থনীতির ভারসাম্য
রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে ডলার সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রপ্তানি আয়ের বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পোশাক খাতের এই ধাক্কা যদি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না যায়, তবে কর্মসংস্থান এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রেমিটেন্স আমাদের তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু টেকসই অর্থনীতির জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক তৈরিতে আমাদের আরও মনোযোগী হতে হবে বলেও জানান তিনি। ড. জাহিদ বলেন, নতুন বাজার যেমন: ব্রাজিল, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি স্থানের অন্বেষণ করা। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। উচ্চমূল্যের এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো ইত্যাদি। তিনি আরো বলেন, রপ্তানি খাতের এ সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, রেমিটেন্সের সাফল্য ম্লান হয়ে যেতে পারে রপ্তানি খাতের বড় ধাক্কায়।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সেইসঙ্গে রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ধস। এ যেন দেশের অর্থনীতির এক বৈপরীত্যের চিত্র।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান ভিত্তি রপ্তানি খাত। এ খাতে এককভাবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ গুরুত্বপূর্ণ খাতে টানা ধস দেখা যাচ্ছে। গত ৮ মাস ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ ৯ মাসে শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের অধিকাংশ দেশেই রপ্তানি আয় কমেছে। এই বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, জাপান ও ডেনমার্ক।
বাজারভিত্তিক পতনের চিত্র
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্যানুযায়ী, প্রথাগত এবং বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পোশাকের চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। শীর্ষ ১০টি বাজারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রপ্তানির প্রধান বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় কমানোর ফলে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমেছে।
৯ বাজারে ধস: বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব দেশের মধ্যে ৯টি বাজারেই আগের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম স্পেন, যেখানে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে কিছু বাজার দখল করে নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার জার্মানিতে রপ্তানির পতন সবচেয়ে বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশটিতে রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। অর্থমূল্যে এর পরিমাণ ৫৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয় ৩৮০ কোটি ডলার থেকে নেমে ৩২৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পতন হয়েছে ডেনমার্কে ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। আগের ৮০ কোটি ডলার থেকে আয় নেমে এসেছে ৬৯ কোটি ডলারে। ফ্রান্সেও রপ্তানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে আয় দাঁড়িয়েছে ১৪৫ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬৫ কোটি ডলার।
ইপিবির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় বাজারসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, পরিমাণের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পতন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এই সময়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৫৫৯ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৭৪ কোটি ডলার।
দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি বাজার হিসেবে ফ্রান্সের অবস্থান রয়েছে। দেশটিতে একই সময়ে তুলনামূলকভাবে রপ্তানি কমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা এই দেশটিতে ৩৩০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৩৬ কোটি ডলার। এতে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬১ শতাংশ।
কেন নিম্নমুখী প্রবণতা
রপ্তানি কমার পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু কারণকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ইউরোপ ও আমেরিকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ পোশাকের পেছনে খরচ কমিয়ে দিয়েছে। দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া বন্দর জটিলতা ও কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের কারণে সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা মনে করেছিলাম- শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে অনেক অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। এপ্রিল বা মে মাস থেকে ভালো রপ্তানি অর্ডার পাবো। যা আগস্টে রপ্তানি আয়ের হিসেবে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এখন কবে রপ্তানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, তা বলা কঠিন।
তিনি বলেন, একেক বাজারে রপ্তানি কমার পেছনে অভিন্ন কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম- মার্কিন পাল্টা শুল্ক, শুল্কনীতির কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর আক্রমণাত্মক বাণিজ্য কৌশল এবং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রেমিটেন্স বনাম রপ্তানি: অর্থনীতির ভারসাম্য
রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে ডলার সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রপ্তানি আয়ের বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পোশাক খাতের এই ধাক্কা যদি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না যায়, তবে কর্মসংস্থান এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রেমিটেন্স আমাদের তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু টেকসই অর্থনীতির জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক তৈরিতে আমাদের আরও মনোযোগী হতে হবে বলেও জানান তিনি। ড. জাহিদ বলেন, নতুন বাজার যেমন: ব্রাজিল, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি স্থানের অন্বেষণ করা। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। উচ্চমূল্যের এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো ইত্যাদি। তিনি আরো বলেন, রপ্তানি খাতের এ সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, রেমিটেন্সের সাফল্য ম্লান হয়ে যেতে পারে রপ্তানি খাতের বড় ধাক্কায়।

রপ্তানি ভাটায় পোশাক খাতে অস্বস্তি
মরিয়ম সেঁজুতি

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সেইসঙ্গে রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ধস। এ যেন দেশের অর্থনীতির এক বৈপরীত্যের চিত্র।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান ভিত্তি রপ্তানি খাত। এ খাতে এককভাবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ গুরুত্বপূর্ণ খাতে টানা ধস দেখা যাচ্ছে। গত ৮ মাস ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ ৯ মাসে শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের অধিকাংশ দেশেই রপ্তানি আয় কমেছে। এই বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, জাপান ও ডেনমার্ক।
বাজারভিত্তিক পতনের চিত্র
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্যানুযায়ী, প্রথাগত এবং বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পোশাকের চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। শীর্ষ ১০টি বাজারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রপ্তানির প্রধান বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় কমানোর ফলে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমেছে।
৯ বাজারে ধস: বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব দেশের মধ্যে ৯টি বাজারেই আগের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম স্পেন, যেখানে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে কিছু বাজার দখল করে নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার জার্মানিতে রপ্তানির পতন সবচেয়ে বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশটিতে রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। অর্থমূল্যে এর পরিমাণ ৫৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয় ৩৮০ কোটি ডলার থেকে নেমে ৩২৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পতন হয়েছে ডেনমার্কে ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। আগের ৮০ কোটি ডলার থেকে আয় নেমে এসেছে ৬৯ কোটি ডলারে। ফ্রান্সেও রপ্তানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে আয় দাঁড়িয়েছে ১৪৫ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬৫ কোটি ডলার।
ইপিবির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় বাজারসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, পরিমাণের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পতন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এই সময়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৫৫৯ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৭৪ কোটি ডলার।
দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি বাজার হিসেবে ফ্রান্সের অবস্থান রয়েছে। দেশটিতে একই সময়ে তুলনামূলকভাবে রপ্তানি কমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা এই দেশটিতে ৩৩০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৩৬ কোটি ডলার। এতে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬১ শতাংশ।
কেন নিম্নমুখী প্রবণতা
রপ্তানি কমার পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু কারণকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ইউরোপ ও আমেরিকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ পোশাকের পেছনে খরচ কমিয়ে দিয়েছে। দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া বন্দর জটিলতা ও কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের কারণে সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা মনে করেছিলাম- শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে অনেক অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। এপ্রিল বা মে মাস থেকে ভালো রপ্তানি অর্ডার পাবো। যা আগস্টে রপ্তানি আয়ের হিসেবে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এখন কবে রপ্তানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, তা বলা কঠিন।
তিনি বলেন, একেক বাজারে রপ্তানি কমার পেছনে অভিন্ন কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম- মার্কিন পাল্টা শুল্ক, শুল্কনীতির কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর আক্রমণাত্মক বাণিজ্য কৌশল এবং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রেমিটেন্স বনাম রপ্তানি: অর্থনীতির ভারসাম্য
রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে ডলার সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রপ্তানি আয়ের বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পোশাক খাতের এই ধাক্কা যদি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না যায়, তবে কর্মসংস্থান এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রেমিটেন্স আমাদের তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু টেকসই অর্থনীতির জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক তৈরিতে আমাদের আরও মনোযোগী হতে হবে বলেও জানান তিনি। ড. জাহিদ বলেন, নতুন বাজার যেমন: ব্রাজিল, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি স্থানের অন্বেষণ করা। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। উচ্চমূল্যের এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো ইত্যাদি। তিনি আরো বলেন, রপ্তানি খাতের এ সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, রেমিটেন্সের সাফল্য ম্লান হয়ে যেতে পারে রপ্তানি খাতের বড় ধাক্কায়।




