
সিটিজেন ডেস্ক

লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে এবং তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে জানান, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিল-এ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে এবং লেবাননের শান্তি ও স্থিতিশীলতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি রাষ্ট্র হিসেবে ভারত বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সংকট নিরসনে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বানও জানায় ভারত।

লেবাননে চলমান ইসরায়েলি বিমান হামলার ফলে দেশজুড়ে শিশুদের ওপর গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে শিশুদের জীবন ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
মঙ্গলবারের একাধিক বিমান হামলায় অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তত ৩৩ জন শিশু নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে আরও ১৫৩ জন। ইউনিসেফ বলছে, এ ধরনের ঘটনাগুলো শিশুদের জন্য এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সহিংসতার ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত লেবাননে প্রায় ৬০০ শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। এই সংখ্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
এদিকে, সংঘাতের কারণে দেশজুড়ে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজারই শিশু, যাদের অনেকেই একাধিকবার স্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে, ফলে তাদের জীবন আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশুদের উদ্ধারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেক শিশু এখনও নিখোঁজ রয়েছে, কেউ কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিজের ঘরবাড়ি ও প্রিয়জন হারিয়ে অসংখ্য শিশু গভীর মানসিক আঘাতের শিকার হচ্ছে।
ইউনিসেফ জোর দিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী শিশু ও অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকদের সব সময় সুরক্ষিত রাখা বাধ্যতামূলক। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ নীতির যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি।

লেবাননে চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে গভীর মানবিক সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশজুড়ে ইতোমধ্যে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং সাম্প্রতিক সহিংসতায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা ‘বিধ্বংসী মানবিক পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করেছে।
ডব্লিউএফপির তথ্যমতে, গত মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় শত শত হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রাথমিক হিসেবে বুধবার দেশজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩০৩ জন নিহত এবং ১,১৫০ জন আহত হয়েছেন।
লেবাননে ডব্লিউএফপির কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালিসন ওমান লাউই বলেন, সংকট শুরুর পর থেকেই তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন এবং লাখো মানুষের কাছে খাদ্য ও নগদ সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হলে সংস্থাটির জন্য ‘নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার’ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে না পারলে, বিপদে পড়া পরিবারগুলোর কাছে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত মানবিক সহায়তা জোরদার না করা হলে লেবাননের সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আসন্ন আলোচনা ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে, যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে তেহরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনা। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইসলামাবাদে, তবে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, কোন পর্যায়ের প্রতিনিধি এই আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—এই আলোচনা তাদের আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উপস্থাপিত ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতেই এগোতে হবে। ফলে শুরু থেকেই আলোচনাটি কঠিন হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য থাকায় সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিরোধ অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি তেহরান ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননসহ বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি হামলার ফলে আঞ্চলিক প্রভাবের কিছু অংশ হারিয়েছে ইরান—এমন বিশ্লেষণও সামনে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে তেহরান হরমুজ প্রণালিকে নতুন করে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া, ইরানি কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেল ট্যাঙ্কার ও অন্যান্য জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন। এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির রাষ্ট্রপতির জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ জানিয়েছেন, আমিরাত এখন নতুন বাস্তবতায় ‘কার ওপর নির্ভর করা যায়’—তা নির্ধারণে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে গারগাশ বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর আমিরাত তার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্কের কাঠামো গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে। তার ভাষায়, ‘একটি বিশ্বাসঘাতক আক্রমণের প্রেক্ষিতে আমরা বিজয়ীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মানচিত্র নতুন করে খতিয়ে দেখব এবং নির্ধারণ করব কার ওপর নির্ভর করা যায়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই পুনর্মূল্যায়নের অংশ হিসেবে দেশটি অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে চায়। লক্ষ্য হবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা জাতীয় উন্নয়ন মডেলের স্থিতিস্থাপকতা আরও শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াবে।
গারগাশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনা করাই আমিরাতের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান পথ।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলায় দেশজুড়ে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সংস্থাটির প্রধান পিরহোসেন কোলিভান্দের বরাতে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক সংবাদ সংস্থা (আইআরএনএ) এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩০টি বেসামরিক স্থাপনা এসব হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৫০০টি বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে ৩৩৯টি চিকিৎসাসেবা-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতাল, ফার্মেসি, ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং জরুরি চিকিৎসা বিভাগ অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর এমন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ইরানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।

লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ইসরায়েলের তীব্র বিমান হামলার জবাবে সীমান্তে রকেট ছুড়ছে হিজবুল্লাহ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমেছে বলে জানা গেছে। যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর না হলেও উভয় পক্ষের হামলার তীব্রতায় নিম্নগতি দেখা যাচ্ছে।
ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন স্থানে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে এবং পাশাপাশি কামান থেকেও গোলাবর্ষণ করেছে। এর জবাবে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে।
তবে গত বুধবারের বড় ধরনের হামলার পর থেকে শেষ ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী বৈরুতে নতুন করে কোনো ইসরায়েলি হামলার খবর পাওয়া যায়নি। পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণেই হয়তো ইসরায়েল সহিংসতা কিছুটা কমিয়ে এনেছে। কারণ, তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিকে টিকিয়ে রাখা।
অন্যদিকে, ইরানও এই চুক্তি বহাল রাখতে আগ্রহী বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে কারণে তেহরান লেবানন ফ্রন্টকেও আলোচনার আওতায় আনার জন্য জোর দিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, লেবানন সরকার আবারও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিষয়টি দেশটির অভ্যন্তরে বেশ বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। লেবাননের রাষ্ট্রপতি এই আলোচনাকে যুদ্ধবিরতির শর্তের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, যা বাস্তবায়নে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে—কারণ ইসরায়েল এ শর্ত মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই মনে করেন, লেবানন সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত। ফলে মাঠপর্যায়ে সংঘর্ষ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও, পরিস্থিতির চাপে দেশটিকে কোনো না কোনো ধরনের আলোচনায় যেতে হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার জবাবে তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অন্তত এক ডজন ঘাঁটির অবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে উঠেছে যে সেগুলো এখন কার্যত অকার্যকর, এমনকি মার্কিন বাহিনীর জন্য উল্টো ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত মাসে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে প্রথম এ বিষয়ে বিস্তারিত উঠে আসে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ইরানের হামলার পর অনেক ঘাঁটিই প্রায় ‘বসবাসের অনুপযোগী’ অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তবে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি ট্রাম্প প্রশাসন।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ‘আরব সেন্টার’-এর বার্ষিক সম্মেলনে বার্ষিক সম্মেলনে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মার্ক লিঞ্চ বলেন, ‘গত এক মাসে ইরান মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যের অবকাঠামোকে অচল করে দিয়েছে। কিন্তু এসব ঘাঁটির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো স্পষ্টভাবে সামনে আসছে না।’
মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমান—এই ছয়টি দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পেন্টাগন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে এসব অঞ্চলের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত কোনো ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে হামলার জন্য ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে।
মার্ক লিঞ্চ আরও জানান, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রায় ৯ হাজার সেনা সদস্যের এই ঘাঁটিটি বর্তমানে এতটাই অরক্ষিত হয়ে উঠেছে যে সেখানে পুনরায় নৌবহর মোতায়েন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক কৌশল এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যত ভেঙে পড়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই

ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।
দোহাভিত্তিক দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, ব্যাপক সামরিক চাপ সত্ত্বেও ইরান এখনো তার গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে, যা আসন্ন যেকোনো আলোচনায় দেশটিকে শক্ত অবস্থানে রাখবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, টানা প্রায় ছয় সপ্তাহের তীব্র বোমাবর্ষণের পরও যুক্তরাষ্ট্র তার মূল লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। ইরানের শাসনব্যবস্থা অক্ষত রয়েছে, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কও সক্রিয় আছে, এবং দেশটির কাছে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সামরিক প্রস্তুতিও ইরানের রয়েছে। বিশেষ করে, তাদের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনো ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলমাসরি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান নতুন একটি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে—হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তার। এই জলপথটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তার মতে, এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ‘বিপর্যয়কর পরিস্থিতি’ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
তবে তিনি এ-ও বলেন, ইরান আলোচনায় কিছু সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও সব দাবিতে সমঝোতা অর্জন সম্ভব নয়। বিশেষ করে, আলোচনার প্রস্তাবিত ১০ দফার মধ্যে অন্তত চারটি অর্থনৈতিক বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহজে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

দক্ষিণ লেবাননে আবারও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। আল জাজিরার এক সংবাদদাতার বরাতে জানা গেছে, দেশটির আল শাহাবিয়া ও জাবাল আল বাতম শহরে পৃথক দুটি হামলা চালানো হয়েছে।
এসব হামলার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে ইসরায়েলের নতুন হুমকি। লেবাননে অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করে হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। দেশটির সামরিক মুখপাত্র অভিচয় আদরাই অভিযোগ করেছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ অ্যাম্বুলেন্সকে ‘ব্যাপকভাবে সামরিক কাজে’ ব্যবহার করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ যেসব স্থাপনা বা যানবাহন সামরিক কাজে ব্যবহার করছে—তার মধ্যে চিকিৎসা কেন্দ্র ও অ্যাম্বুলেন্সও থাকলে—সেগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এখন পর্যন্ত এই অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এমন হুমকি বাস্তবায়িত হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধ আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এতে বেসামরিক মানুষের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে পাকিস্তান ও ফ্রান্স।
আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে অনুষ্ঠিত এক টেলিফোন আলাপে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আলোচনায় তারা লেবাননে সংঘটিত গুরুতর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন। উভয় দেশ যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা এবং তা যথাযথভাবে মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তান দাবি করেছে যে, ওই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে ফ্রান্সের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। দেশটি মনে করে, যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত এবং সেখানে সহিংসতা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসহাক দার ও জঁ-নোয়েল বারো তাদের আলোচনায় চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের ওপর জোর দেন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
গত বুধবার (৮ এপ্রিল) যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েল স্মরণকালের ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়। এ হামলায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।