ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল আজ, বাংলাদেশিদের জন্য দিনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল আজ, বাংলাদেশিদের জন্য দিনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল। ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে প্রধম বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ হয়। এজন্য দিনটি বাংলাদেশিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা দিতে গড়িমসি করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি। সর্বশেষ ২৫ মার্চ (১৯৭১) রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পরদিন এই খবর ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় বাংলাদেশিরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেদিনই শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। ২৫ মার্চ রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে পাকিস্তানি বাহিনী। একদিকে কেন্দ্রীয় নেতা কারাগারে, অন্যদিকে নেতৃত্বহীন পুরো জাতি।
এমতাবস্থায় সাধারণ ছাত্র-জনতা ও পূর্ব বাংলার সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। সাধারণ জনতা আধুনিক অস্ত্র ব্যতিরেকেই দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারা দেশে এভাবে খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধগুলো চললেও তখনও কেন্দ্রীয় কোনো কমান্ড ছিলো না।
২৫ মার্চের মধ্যরাতেই পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন সাধারণ মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, ছাত্র-যুবসমাজের সদস্যরা; পাশাপাশি ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক ও কর্মকর্তারাও। এসব বাহিনীর ওপর হামলা শুরু হতেই তাদের অধিকাংশ সদস্য দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে প্রথমদিকে সেই প্রতিরোধ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও অপরিকল্পিত।
এ পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট রণাঙ্গন নির্ধারণ এবং একক চেইন অব কমান্ডের আওতায় দায়িত্ব বণ্টন। তা না হলে যুদ্ধকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো না।
এই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা ছিল অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করাও ছিল অপরিহার্য। কারণ, এটি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই কথাগুলোই বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি এও প্রমাণ করা দরকার ছিল যে, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে দেশের জনগণ এবং স্বাধীনতার পক্ষে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।
মুজিবনগর সরকার গঠনের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অনেকটাই অর্জিত হয়। এই সরকারই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সে সময় বিশ্ব ছিল স্নায়ুযুদ্ধের টানাপোড়েনে বিভক্ত। একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বলয়, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রপন্থী দেশ। পরবর্তীতে অনেক দেশ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থন জানালেও বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। বিশেষ করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ় অবস্থান নেয়।
এদিকে ভারত ও রাশিয়া বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের অবস্থান থাকলেও সরাসরি সহযোগিতা তখনও শুরু হয়নি। এজন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আর এই কাজটি করেন তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকার।
২৫ মার্চের রাতেই তাজউদ্দীন আহমদ নিজ বাসভবন ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া হয়ে তিনি মেহেরপুরে পৌঁছান এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখান থেকেই মূলত বাংলাদেশ সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু হয়। আত্মরক্ষা, প্রস্তুতি এবং পরবর্তীতে পাল্টা আক্রমণ এই কৌশলকে সংগঠিতভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে তিনি সরকার গঠনের চিন্তা এগিয়ে নেন।
মুক্তিবাহিনী গঠনের জন্য তাজউদ্দীন আহমদ বিএসএফ প্রধান কে. এফ. রুস্তমজীর কাছে সহায়তা চান। তবে তিনি জানান, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ সময়সাপেক্ষ এবং সে সময় পর্যন্ত ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় তা সম্ভব নয়। পরে রুস্তমজী দিল্লিতে যোগাযোগ করলে তাজউদ্দীনকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ আসে। ৪ এপ্রিল তার সাক্ষাৎ হয় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। দিল্লিতে বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে ভারত সরকার নিশ্চিত হয় যে তাজউদ্দীনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হন।
সাক্ষাতে তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সহায়তার জন্য ভারতের সহযোগিতা চান। দিল্লি থেকে ফিরে তিনি দ্রুত সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠনের কাজে মনোনিবেশ করেন।
১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ ও জারি করা হয়। এর প্রধান প্রণেতা ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। এই ঘোষণাপত্র কার্যত স্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সংবিধান হিসেবে কাজ করে। এতে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। একইসঙ্গে এটি বিশ্বকে জানিয়ে দেয় যে মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং একটি বৈধ সরকারের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতার সংগ্রাম।
এরপর ১৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সাংবিধানিক পদক্ষেপ।
অনেকে প্রশ্ন করেন, ১৭ এপ্রিল শপথের আগে কেন ১০ এপ্রিল ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে ছিল সুস্পষ্ট কৌশলগত কারণ। ১০ এপ্রিলের ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা বিদ্রোহী থেকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৈনিকে পরিণত হন। এতে ভারতের জন্য বাংলাদেশকে সরাসরি সামরিক ও মানবিক সহায়তা দেওয়া সহজ হয়। পাশাপাশি প্রবাসী সরকার যুদ্ধ পরিচালনা, কর আরোপ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি করার বৈধতা পায়।
এই আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম বাগানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিতে সক্ষম হয়। তাই বলা যায়, ১০ এপ্রিলের ঘোষণা ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ভিত্তি, আর ১৭ এপ্রিলের শপথ ছিল তার দৃশ্যমান রূপ। ১০ এপ্রিলের এই পদক্ষেপ না থাকলে মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৃহযুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ত। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১০ এপ্রিল একটি অনিবার্য ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন।

আজ ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল। ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে প্রধম বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ হয়। এজন্য দিনটি বাংলাদেশিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা দিতে গড়িমসি করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি। সর্বশেষ ২৫ মার্চ (১৯৭১) রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পরদিন এই খবর ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় বাংলাদেশিরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেদিনই শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। ২৫ মার্চ রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে পাকিস্তানি বাহিনী। একদিকে কেন্দ্রীয় নেতা কারাগারে, অন্যদিকে নেতৃত্বহীন পুরো জাতি।
এমতাবস্থায় সাধারণ ছাত্র-জনতা ও পূর্ব বাংলার সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। সাধারণ জনতা আধুনিক অস্ত্র ব্যতিরেকেই দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারা দেশে এভাবে খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধগুলো চললেও তখনও কেন্দ্রীয় কোনো কমান্ড ছিলো না।
২৫ মার্চের মধ্যরাতেই পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন সাধারণ মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, ছাত্র-যুবসমাজের সদস্যরা; পাশাপাশি ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক ও কর্মকর্তারাও। এসব বাহিনীর ওপর হামলা শুরু হতেই তাদের অধিকাংশ সদস্য দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে প্রথমদিকে সেই প্রতিরোধ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও অপরিকল্পিত।
এ পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট রণাঙ্গন নির্ধারণ এবং একক চেইন অব কমান্ডের আওতায় দায়িত্ব বণ্টন। তা না হলে যুদ্ধকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো না।
এই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা ছিল অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করাও ছিল অপরিহার্য। কারণ, এটি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই কথাগুলোই বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি এও প্রমাণ করা দরকার ছিল যে, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে দেশের জনগণ এবং স্বাধীনতার পক্ষে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।
মুজিবনগর সরকার গঠনের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অনেকটাই অর্জিত হয়। এই সরকারই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সে সময় বিশ্ব ছিল স্নায়ুযুদ্ধের টানাপোড়েনে বিভক্ত। একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বলয়, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রপন্থী দেশ। পরবর্তীতে অনেক দেশ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থন জানালেও বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। বিশেষ করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ় অবস্থান নেয়।
এদিকে ভারত ও রাশিয়া বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের অবস্থান থাকলেও সরাসরি সহযোগিতা তখনও শুরু হয়নি। এজন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আর এই কাজটি করেন তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকার।
২৫ মার্চের রাতেই তাজউদ্দীন আহমদ নিজ বাসভবন ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া হয়ে তিনি মেহেরপুরে পৌঁছান এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখান থেকেই মূলত বাংলাদেশ সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু হয়। আত্মরক্ষা, প্রস্তুতি এবং পরবর্তীতে পাল্টা আক্রমণ এই কৌশলকে সংগঠিতভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে তিনি সরকার গঠনের চিন্তা এগিয়ে নেন।
মুক্তিবাহিনী গঠনের জন্য তাজউদ্দীন আহমদ বিএসএফ প্রধান কে. এফ. রুস্তমজীর কাছে সহায়তা চান। তবে তিনি জানান, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ সময়সাপেক্ষ এবং সে সময় পর্যন্ত ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় তা সম্ভব নয়। পরে রুস্তমজী দিল্লিতে যোগাযোগ করলে তাজউদ্দীনকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ আসে। ৪ এপ্রিল তার সাক্ষাৎ হয় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। দিল্লিতে বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে ভারত সরকার নিশ্চিত হয় যে তাজউদ্দীনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হন।
সাক্ষাতে তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সহায়তার জন্য ভারতের সহযোগিতা চান। দিল্লি থেকে ফিরে তিনি দ্রুত সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠনের কাজে মনোনিবেশ করেন।
১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ ও জারি করা হয়। এর প্রধান প্রণেতা ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। এই ঘোষণাপত্র কার্যত স্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সংবিধান হিসেবে কাজ করে। এতে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। একইসঙ্গে এটি বিশ্বকে জানিয়ে দেয় যে মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং একটি বৈধ সরকারের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতার সংগ্রাম।
এরপর ১৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সাংবিধানিক পদক্ষেপ।
অনেকে প্রশ্ন করেন, ১৭ এপ্রিল শপথের আগে কেন ১০ এপ্রিল ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে ছিল সুস্পষ্ট কৌশলগত কারণ। ১০ এপ্রিলের ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা বিদ্রোহী থেকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৈনিকে পরিণত হন। এতে ভারতের জন্য বাংলাদেশকে সরাসরি সামরিক ও মানবিক সহায়তা দেওয়া সহজ হয়। পাশাপাশি প্রবাসী সরকার যুদ্ধ পরিচালনা, কর আরোপ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি করার বৈধতা পায়।
এই আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম বাগানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিতে সক্ষম হয়। তাই বলা যায়, ১০ এপ্রিলের ঘোষণা ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ভিত্তি, আর ১৭ এপ্রিলের শপথ ছিল তার দৃশ্যমান রূপ। ১০ এপ্রিলের এই পদক্ষেপ না থাকলে মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৃহযুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ত। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১০ এপ্রিল একটি অনিবার্য ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন।

ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল আজ, বাংলাদেশিদের জন্য দিনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল। ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে প্রধম বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ হয়। এজন্য দিনটি বাংলাদেশিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা দিতে গড়িমসি করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি। সর্বশেষ ২৫ মার্চ (১৯৭১) রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পরদিন এই খবর ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় বাংলাদেশিরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেদিনই শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। ২৫ মার্চ রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে পাকিস্তানি বাহিনী। একদিকে কেন্দ্রীয় নেতা কারাগারে, অন্যদিকে নেতৃত্বহীন পুরো জাতি।
এমতাবস্থায় সাধারণ ছাত্র-জনতা ও পূর্ব বাংলার সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। সাধারণ জনতা আধুনিক অস্ত্র ব্যতিরেকেই দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারা দেশে এভাবে খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধগুলো চললেও তখনও কেন্দ্রীয় কোনো কমান্ড ছিলো না।
২৫ মার্চের মধ্যরাতেই পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন সাধারণ মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, ছাত্র-যুবসমাজের সদস্যরা; পাশাপাশি ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক ও কর্মকর্তারাও। এসব বাহিনীর ওপর হামলা শুরু হতেই তাদের অধিকাংশ সদস্য দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে প্রথমদিকে সেই প্রতিরোধ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও অপরিকল্পিত।
এ পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট রণাঙ্গন নির্ধারণ এবং একক চেইন অব কমান্ডের আওতায় দায়িত্ব বণ্টন। তা না হলে যুদ্ধকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো না।
এই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা ছিল অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করাও ছিল অপরিহার্য। কারণ, এটি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই কথাগুলোই বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি এও প্রমাণ করা দরকার ছিল যে, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে দেশের জনগণ এবং স্বাধীনতার পক্ষে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।
মুজিবনগর সরকার গঠনের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অনেকটাই অর্জিত হয়। এই সরকারই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সে সময় বিশ্ব ছিল স্নায়ুযুদ্ধের টানাপোড়েনে বিভক্ত। একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বলয়, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রপন্থী দেশ। পরবর্তীতে অনেক দেশ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থন জানালেও বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। বিশেষ করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ় অবস্থান নেয়।
এদিকে ভারত ও রাশিয়া বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের অবস্থান থাকলেও সরাসরি সহযোগিতা তখনও শুরু হয়নি। এজন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আর এই কাজটি করেন তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকার।
২৫ মার্চের রাতেই তাজউদ্দীন আহমদ নিজ বাসভবন ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া হয়ে তিনি মেহেরপুরে পৌঁছান এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখান থেকেই মূলত বাংলাদেশ সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু হয়। আত্মরক্ষা, প্রস্তুতি এবং পরবর্তীতে পাল্টা আক্রমণ এই কৌশলকে সংগঠিতভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে তিনি সরকার গঠনের চিন্তা এগিয়ে নেন।
মুক্তিবাহিনী গঠনের জন্য তাজউদ্দীন আহমদ বিএসএফ প্রধান কে. এফ. রুস্তমজীর কাছে সহায়তা চান। তবে তিনি জানান, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ সময়সাপেক্ষ এবং সে সময় পর্যন্ত ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় তা সম্ভব নয়। পরে রুস্তমজী দিল্লিতে যোগাযোগ করলে তাজউদ্দীনকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ আসে। ৪ এপ্রিল তার সাক্ষাৎ হয় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। দিল্লিতে বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে ভারত সরকার নিশ্চিত হয় যে তাজউদ্দীনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হন।
সাক্ষাতে তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সহায়তার জন্য ভারতের সহযোগিতা চান। দিল্লি থেকে ফিরে তিনি দ্রুত সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠনের কাজে মনোনিবেশ করেন।
১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ ও জারি করা হয়। এর প্রধান প্রণেতা ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। এই ঘোষণাপত্র কার্যত স্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সংবিধান হিসেবে কাজ করে। এতে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। একইসঙ্গে এটি বিশ্বকে জানিয়ে দেয় যে মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং একটি বৈধ সরকারের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতার সংগ্রাম।
এরপর ১৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সাংবিধানিক পদক্ষেপ।
অনেকে প্রশ্ন করেন, ১৭ এপ্রিল শপথের আগে কেন ১০ এপ্রিল ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে ছিল সুস্পষ্ট কৌশলগত কারণ। ১০ এপ্রিলের ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা বিদ্রোহী থেকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৈনিকে পরিণত হন। এতে ভারতের জন্য বাংলাদেশকে সরাসরি সামরিক ও মানবিক সহায়তা দেওয়া সহজ হয়। পাশাপাশি প্রবাসী সরকার যুদ্ধ পরিচালনা, কর আরোপ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি করার বৈধতা পায়।
এই আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম বাগানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিতে সক্ষম হয়। তাই বলা যায়, ১০ এপ্রিলের ঘোষণা ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ভিত্তি, আর ১৭ এপ্রিলের শপথ ছিল তার দৃশ্যমান রূপ। ১০ এপ্রিলের এই পদক্ষেপ না থাকলে মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৃহযুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ত। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১০ এপ্রিল একটি অনিবার্য ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন।




