শিরোনাম

ইরানের ভিডিওগুলো যেভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জয়ী হলো

সিটিজেন ডেস্ক
ইরানের ভিডিওগুলো যেভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জয়ী হলো
‘সবার জন্য এক প্রতিশোধ’ শিরোনামে ভাইরাল হওয়া ইরানের একটি ভিডিওর একটি চরিত্র। ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক নতুন ধরনের ভিডিও কনটেন্ট নজর কাড়ছে। লেগো-ধাঁচের অ্যানিমেশন ব্যবহার করে তৈরি এসব ভিডিও এখন কেবল বিনোদন নয়—বরং মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি ‘সবার জন্য এক প্রতিশোধ’ শিরোনামে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাঁদের আলোয় আলোকিত এক শূন্য প্রান্তরে ঘোড়ায় চড়ে প্রবেশ করছেন এক আদিবাসী আমেরিকান সর্দার। এরপর দ্রুত পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট—শিকলবন্দী কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ থেকে শুরু করে আবু গারিব কারাগার থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের মতো নানা ঐতিহাসিক ঘটনার চিত্র উঠে আসে।

ভিডিওর পরের অংশে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে একের পর এক বার্তা লেখা হচ্ছে—‘অপহৃত কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য’, ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষের জন্য’, ‘ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে’—এমন নানা ইতিহাস। একই সঙ্গে যুক্ত করা হয় মার্কিন সামরিক অভিযানের শিকার আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম ও ইরাকের মানুষের কথাও।

ভিডিওটির শেষ দৃশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতীকী মূর্তি ভেঙে পড়তে দেখা যায়। পর্দায় ভেসে ওঠে একটি বার্তা—‘সবার জন্য এক প্রতিশোধ’।

ভিডিওটির শেষ দৃশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতীকী মূর্তি ভেঙে পড়তে দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত
ভিডিওটির শেষ দৃশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতীকী মূর্তি ভেঙে পড়তে দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত

এই ভিডিওটি তৈরি করেছে ইরানভিত্তিক ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’ নামের একটি দল। তারা লেগোর মতো ব্লক ও চরিত্র ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে এমন কনটেন্ট তৈরি করছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। একাধিক ভিডিও ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দর্শক পেয়েছে।

তবে তাদের পথ সহজ ছিল না। অভিযোগ উঠেছে সহিংসতা প্রচারের, যার ফলে তাদের ইউটিউব চ্যানেল সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দলের এক মুখপাত্র বলেন, তারা এতে বিস্মিত নন। তার দাবি, পশ্চিমা প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক সময় নিজেদের অস্বস্তিকর সত্যকে আড়াল করতে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

এই ভিডিওগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতীকী ভাষা। নির্মাতাদের মতে, অ্যানিমেশনে ব্যবহৃত সবুজ রং ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রামের প্রতীক, যা ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর লাল রং বোঝায় নিপীড়ন ও অত্যাচার।

ভিডিওগুলোতে কেবল ইতিহাস নয়, সমসাময়িক রাজনীতিও উঠে আসছে। কোথাও ‘এপস্টাইন শাসন’ বা ‘পরাজিত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, আবার কোথাও ট্রাম্পের সমর্থকদের লাল টুপি—যেখানে তার প্রচারণার স্লোগান ‘ম্যাগা’—দেখানো হয়েছে। এসবের মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বৈপরীত্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই কনটেন্ট তৈরি করছে তরুণদের একটি দল, যাদের বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তারা নিজেদের স্বাধীন বলে দাবি করলেও স্বীকার করেছে, ইরানের কিছু রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যম তাদের তৈরি কনটেন্ট কিনে প্রচার করে।

শুধু এক্সপ্লোসিভ মিডিয়াই নয়, আরও কিছু নির্মাতা—যেমন পার্সিয়াবয় বা সাউদার্ন পাঙ্ক—একই ধরণের ভিডিও তৈরি করছে। এই প্রবণতা ইতোমধ্যে ইরানের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি ইসলামাবাদেও এর প্রভাব দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ভিডিওর মূল শক্তি হলো এগুলোর উপস্থাপনা। সহজ, পরিচিত লেগো স্টাইল ব্যবহার করে জটিল রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে এটি সহজেই বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারছে।

ভিডিওতে মার্কিন সামরিক অভিযানের শিকার আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম ও ইরাকের মানুষের কথাও বলা হয়। ছবি: সংগৃহীত
ভিডিওতে মার্কিন সামরিক অভিযানের শিকার আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম ও ইরাকের মানুষের কথাও বলা হয়। ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক ভাষ্যকারদের মতে, এই ভিডিওগুলো পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রচলিত বয়ানের বিপরীতে একটি বিকল্প আখ্যান দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন—যেমন বিতর্কিত এপস্টাইন ইস্যু—তুলে ধরে তারা আলোচনাকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, মিডিয়া বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও জনমত গঠনের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকার কৌশল হিসেবে ইরান এ ধরনের কনটেন্ট ব্যবহার করছে। তাদের মতে, আধুনিক সময়ে তথ্য ও যোগাযোগের এই লড়াইই অনেক ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

সব মিলিয়ে, লেগো-ধাঁচের এই ভিডিওগুলো কেবল সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড নয়—বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মনস্তত্ত্বিক লড়াইয়ের একটি নতুন ও কৌশলী রূপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমআর/