শিরোনাম

দরবারে হামলায় নিহত ‘পীর’ শামীমের দাফন, হয়নি মামলা

দৌলতপুর  (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা
দরবারে হামলায় নিহত ‘পীর’ শামীমের দাফন, হয়নি মামলা
দাফনের জন্য মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন নিহতের পরিবার ও অনুসারীরা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দরবার শরিফে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর হামলায় নিহত ‘পীর’ আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রবিবার (১২ এপ্রিল) বাদ আসর স্থানীয় ঈদগাহে শামীম রেজার জানাজার নামাজ শেষে তাকে দাফন করা হয়।

এদিকে ঘটনার একদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলা হয়নি। দরবারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত কাউকে আটকও করতে পারেনি পুলিশ। তবে এলাকাজুড়ে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রবিবার বেলা ১টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে শামীমের নিজ গ্রাম ফিলিপনগরে মরদেহ নিয়ে আসা হয়। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মরদেহ নিজ গ্রামে পৌঁছায়। এ সময় তার আত্মীয়স্বজন ও কিছুসংখ্যক ভক্ত-অনুসারীর উপস্থিতি দেখা গেলেও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘পীর’ শামীম ছিলেন নিজের মনগড়া এক অদ্ভুত তরিকার মানুষ। তিনি ঢাকঢোল বাজিয়ে গানবাজনার উৎসব করে নিজের অনুসারীদের দাফন করতেন। অনুসারীদের হজ করতে যাওয়া তার বারণ ছিল। তিনি নিজস্ব বাঁশ বাগানে ভক্ত-অনুসারীদের নিয়ে ‘হজ’ করতেন। ভক্তরা তার পায়ে সিজদা করতো। দরবারে আসা নারীদের মাধ্যমে দুধ দিয়ে নিজের দুই পা ধুইয়ে সেই দুধ তাদের খাওয়াতেন।

এসব কারণে শামীমের ভক্তরা তার নিজের দরবারে তাকে দাফন করার অনুরোধ করলে তা নাকচ করে দেয়া হয়। এতে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মুসলিম রীতিতে স্থানীয় ঈদগাহে জানাজা শেষে পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

তবে এখন পর্যন্ত দরবারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে, এখনো নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি। তারা মামলা না করলে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করবে। জড়িতদের শনাক্ত ও আটকে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধর্ম নিয়ে জগাখিচুড়ি অবস্থা ছিল ‘পীর’ শামীমের। তিনি ইদানীং ভোল পাল্টে হিন্দু ধর্মের রীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। এছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মের রীতিরও মিশেল ছিল তার মধ্যে। দরবার শরিফের ভেতর হিন্দুধর্মের সাজগোজ ছাড়াও দরবারের গম্বুজের মাথায় বসানো হয় খ্রিষ্টান ধর্মের সিম্বল। নিজের দেওয়া তার নাম হলো- ‘সাধক শাহসূফী পীর সৈয়দ যিশু কালান্দার ভগবান শ্রী শামীম কৃষ্ণ আল-জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী।’

তিনি কখনো নিজেকে ‘বাংলার নবী’ কখনো ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ’ আবার কখনো ‘যীশুখ্রিস্ট’ দাবি করতেন বলে জানান এলাকাবাসী।

বিক্ষুব্ধ জনতা ‘পীর’ শামীমের দরবার ভাঙচুর করছে। ছবি: সংগৃহীত
বিক্ষুব্ধ জনতা ‘পীর’ শামীমের দরবার ভাঙচুর করছে। ছবি: সংগৃহীত

এর আগে ২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। মাস তিনেক পর জেল থেকে বেরিয়ে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ধর্ম নিয়ে লাগামহীন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। তখন সাদা চুল-দাড়ি রাখলেও ইদানীং দাড়ি ফেলে দিয়ে বাবরি চুলে কালো কলব ব্যবহার করে নিজের বেশভূষা পরিবর্তন করেছেন শামীম।

শুধু তাই নয়, মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে শামীমের সম্পদের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। আগে যেখানে টিনের ঘর ছিল এখন সেখানে দরবার শরিফসহ একাধিক বিল্ডিং উঠেছে। যা দামি আসবাবপত্রে সজ্জিত।

হত্যার ঘটনায় মামলার বিষয় নিহত শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফজলুর রহমান বলেন, রাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেব, আমরা মামলা করব নাকি করব না। বা কি করা যায়।

তিনি আরও বলেন, অভিযোগ থাকলে সমাধান করতে পারত। এভাবে একটা মানুষকে মারা ঠিক হয়নি।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শামীম রেজা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরে তিনি রেডিয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ম্যানেজমেন্টের প্রধান ছিলেন। চাকরিরত অবস্থায় তার বিয়ে হলেও বেশিদিন তাদের সংসার টেকেনি। এরপরে শামীম কেরানীগঞ্জে ‘কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী’র দরবার শরিফে খাদেমের দায়িত্ব নেন। করোনাকালে শামীম এলাকায় ফিরে আসেন। তিনি দরবার শরিফ চালু করে নিজের মতো করে ধর্ম নিয়ে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পুরো উপজেলাবাসী তার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন।

কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, নতুন করে বিশৃঙ্খলা এড়াতে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন অবস্থায় দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। দাফনের পরে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সেজন্য এই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে।

এদিকে, গতকাল রবিবার খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন দরবার শরিফ পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের প্রচলিত আইনে শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি হামলায় জড়িতদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন।

এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা ঢাকা থেকে ফিরেই সরাসরি ফিলিপনগরের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, যত বড়ই অপরাধী হোক কাউকে হত্যা করার অধিকার কারো নেই। তাকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল। সেটা না করে এভাবে ভায়োলেন্স করে হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না।

উল্লেখ্য, পবিত্র কোরআন ও ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরের দিকে ‘পীর’ শামীম রেজার দরবার শরিফে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন স্থানীয়রা। এ সময় বিক্ষুব্ধরা দরবারের দোতলার একটি কক্ষ থেকে বের করে এনে শামীর রেজাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেন। আহত হন শামীমের দুই অনুসারী। ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

/এফআর/