শিরোনাম

৩০৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় গ্রিল না থাকায় শিশুরা ঝুঁকিতে

তামজিদ হাসান তুরাগ, কুড়িগ্রাম
৩০৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় গ্রিল না থাকায় শিশুরা ঝুঁকিতে
বিদ্যালয়। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

কুড়িগ্রাম জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনগুলো যেন শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মরণ ফাঁদ’। একই নকশার ৩০৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বারান্দায় গ্রিল না থাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনা। গত ৭ মাসে জেলায় বিদ্যালয়ের ভবন থেকে পড়ে দুইটি শিশু মারা গেছে।

এ অবস্থায় শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে প্রতিটি বিদ্যালয়ের ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। পাশাপাশি বারান্দা ও ছাদে নিরাপত্তা বেষ্টনির কথাও বলছেন সচেতন নাগরিকরা।

শিক্ষক ও অভিভাবকরা বলছেন, বিদ্যালয়ের ভবনের বারান্দায় শর্ট রেলিং থাকলেও গ্রিল নেই। ভবনগুলোর দ্বিতীয় তলায় বারান্দার সঙ্গে ছাদে যাওয়ার পথ রয়েছে। ফলে শিশু শিক্ষার্থীরা সহজেই ছাদে যেতে পারছে। বিশেষ করে স্কুলে পাঠদান শুরুর আগে এবং টিফিন বিরতির সময় শিক্ষার্থীরা খেলায় মেতে ওঠে। এসময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

বেশিরভাগ স্কুল ভবনের চিত্র একই। সরেজমিন জেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরী উপজেলার পশ্চিম নাগেশ্বরী বটতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদ থেকে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর থেকে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলায় একই নকশার ৩০৬টি স্কুল ভবন রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এসব ভবনের নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেছে। তবে এলজিইডির দাবি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ভবনের নকশা অনুমোদন করেছে। এলজিইডি শুধু বাস্তবায়ন করেছে।

টিফিনের সময় ছাদে অবাধে চলাফেরা শিক্ষার্থীদের

৭ মাসে ভবন থেকে পড়ে ২ শিক্ষার্থীর মৃত্যু

গত ৬ এপ্রিল টিফিন বিরতিতে খেলার সময় চিলমারীর রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কে ডি ওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দার রেলিং টপকে নিচে পড়ে যায় এক শিশু শিক্ষার্থী। তার নাম হাবিবা আক্তার হাসি। সে গুরুতর আঘাত পায় মাথায়। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজে নেওয়ার পথে মারা যায়। হাবিবার মৃত্যুর পর স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে।

হাবিবার মা মরিয়ম বেগম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, স্কুলের বারান্দায় গ্রিল থাকলে আমার মেয়ের এমন করুণ মৃত্যু হতো না। একই স্কুলে আমার ছেলে শিশু শ্রেণিতে পড়ে। আমি চাই না আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক। ওই স্কুলসহ সব স্কুলে গ্রিল দিয়ে বাচ্চাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হোক।

একই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রেজাউলের মা রঞ্জিনা বেগম বলেন, স্কুলের বাচ্চারা সবাই খেলুক। খেলবার যায়া যদি বাচ্চা মারা যায় তাহলে স্কুলে পাঠাই কেমন করে। আমরা চাই সব স্কুলের বারান্দা গ্রিল দিয়ে ঘেরা হোক।

একই দাবি অন্য অভিভাবক ও শিক্ষকদের। কে ডি ওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলিমুল রাজি বলেন, আমাদের স্কুল ভবনের বারান্দায় রেলিং থাকলেও গ্রিল নেই। গ্রিল থাকলে হাবিবার প্রাণ হারাতে হতো না। স্কুল ভবনের বারান্দায় গ্রিল দেওয়া জরুরি।

নাগেশ্বরী উপজেলার কুটি পয়ড়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিফিন বিরতির সময় স্কুলের দ্বিতীয় তলার রেলিং ধরে শিশুরা খেলা করছে। অনেকে ছাদে উঠে রেলিং ধরে সহপাঠীদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহানাজ পারভীন জানালেন, বিদ্যালয়ের ভবনগুলো শিশুদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। এগুলোতে গ্রিল দিয়ে নিরাপদ করা প্রয়োজন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, ভবনগুলোর নকশা শিশুদের জন্য নিরাপদ নয় বরং ক্রটিপূর্ণ। আমরা বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে এগুলো বলে আসছি। পুরো বারান্দায় গ্রিল না থাকায় শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ব্যয়ে কিছু ভবনের বারান্দায় আমরা গ্রিল দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।

কুড়িগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ইউনুস হোসেন বিশ্বাস বলেন, ভবনগুলোর নকশা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর অনুমোদন করেছে। এলজিইডি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। স্থানীয়ভাবে নকশা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এটা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন।

/এসআর/