শিরোনাম

স্মৃতিতে অমলিন ঘোড়াশালের সেই কলোনি

হাসিবুল ফারুক চৌধুরী
স্মৃতিতে অমলিন ঘোড়াশালের সেই কলোনি
ঘোড়াশাল সার কারখানার ডি-টাইপ কোয়ার্টার। ছবি: লেখক

একসময় এখানে ছিল সোনালী দিন। তিনতলা এই ভবনটি ছেলেমেয়েদের কোলাহলে মুখর থাকতো সবসময়। আমাদের বাসা নিচতলায়। পাশের বাসায় সাইফুল, দোতলায় সোহেল, তিনতলায় ইলোরা, সামনের বিল্ডিংয়ে সুমন, পেছনেরটায় জমজ দুই ভাই– তারেক ও খালিদ। সবাই আমরা একসঙ্গে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম।

স্কুলের নাম সার কারখানা উচ্চ বিদ্যালয়। সংক্ষেপে সাকাউবি। ঘোড়াশাল সার কারখানা কলোনির একমাত্র স্কুল। সেটা ১৯৭৭ সালের কথা।

কলোনিতে ছোটদের সকাল শুরু হতো মক্তবে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। ছেলেদের মাথায় টুপি আর মেয়েদের ওড়না। দুই হাত দিয়ে কায়দা বা আমপাড়া বুকে জড়িয়ে তারা মক্তবে যেত। মক্তবটি আসলে বাসার কাছেই ছোট মসজিদ। ইমাম সাহেব থাকতেন মসজিদের পাশেই, একতালা একটি বাসায়।

একদিন ঘুম থেকে উঠতে আমার দেরি হয়ে গেল। আম্মা জোর করে মক্তবে পাঠালেন। আমার চোখে পানি। মক্তবে গিয়ে দেখি কেউ নেই, সবাই চলে গেছে। ইমাম হুজুর দরজা বন্ধ করছেন। আমাকে দেখেই তিনি যেন সব বুঝে ফেললেন। এরপর খুব আদর করে আমাকে নিয়ে গেলেন তার বাসায়। বাইরের ঘরে বসতে দিয়ে ভেতরে গেলেন। ফিরে এলেন কিছুক্ষণ পর। তার হাতে একটি প্লেট। আমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন। সাদা আটার নরম রুটি দুধে ভেজানো, উপরে চিনি ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই খাবার আমার কাছে অমৃতের মতো লাগলো। এর স্বাদ এখনো আমার মুখে রয়েছে।

স্কুল ভবন তখন একতলা। মাঠের অর্ধেকটা উঁচু, সেখানে বড় বড় কয়েকটি গাছ। মাঠের তিন দিকে সারি সারি কক্ষ। এক কোণে কিছু কলাবতী গাছের ঝোপ।

স্কুল সপ্তাহ ছিল ছেলেমেয়েদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের সময়। বছর জুড়ে সবাই এর অপেক্ষায় থাকতো। সাত দিন ধরে চলতো অনুষ্ঠান। একেক দিন একেক আয়োজন। ছাত্র-ছাত্রীদের হাতের কাজের প্রদর্শনী, আবৃত্তি, নাচ-গান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মঞ্চ নাটক– কী নেই।

একবার ব্রতচারী নৃত্যের আয়োজন হলো। মাথায় গামছা বেঁধে, দুই হাতে বাঁশের কঞ্চি নিয়ে সবাই বৃত্তাকার পথে ঘুরে ঘুরে নাচছে। নাচের তালে তালে একে অপরের কঞ্চিতে বাড়ি দিচ্ছে। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে তা উপভোগ করতো।

মাঠের নিচু অংশের উত্তর প্রান্তে সেইবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। মঞ্চের চারপাশে মাজা সমান ইটের গাঁথুনি। মেঝে তখনও পাকা করা হয়নি। মাটিতে বাঁশ পুতে ত্রিপল দিয়ে ঘেরা সেই মঞ্চ।

স্কুল সপ্তাহের কয়েকটা দিন সন্ধ্যার মধ্যে আমাদের ঘরে ফেরার কঠোর নিয়ম কিছুটা শিথিল থাকতো। এক রাতে মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। এদিকে আমি বন্ধুদের সঙ্গে মঞ্চের পেছনে খেলা করছি। হঠাৎ একটি বাঁশের বাতার চোখা অংশ আমার বাঁ গালে বিঁধে গেল। আমি জিহ্বা দিয়ে অনুভব করলাম– গাল ফুটো হয়ে গেছে। এরপর আর কিছু মনে নেই।

জ্ঞান ফেরার পর বুঝতে পারলাম আমি মেডিকেল সেন্টারে। গালে শেলাই পড়েছে। সেই রাত হাসপাতালের বিছানায় কাটাতে হলো।

ঘোড়াশাল সার কারখানার মেডিকেল সেন্টার এখনো আগের মতোই রয়েছে। ছবি: লেখক
ঘোড়াশাল সার কারখানার মেডিকেল সেন্টার এখনো আগের মতোই রয়েছে। ছবি: লেখক

মেডিকেল সেন্টারটি তখন সবেমাত্র নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর সামনের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই শীতলক্ষ্যা নদী। নদীর পাড়ে প্রাচীন এক অশ্বত্থ গাছ। ঘাটে অনেক নৌকা বাঁধা। কলোনির অনেকেই বাজার করতে নৌকায় করে পলাশে যেতেন। আর দূরের যাত্রার জন্য ছিল লঞ্চ। একবার ইট বহন করা নৌকার ধাক্কায় একটি লঞ্চ ডুবে গেল। পরে শুনেছি, এ দুর্ঘটনায় লঞ্চের অনেক যাত্রী মারা গেছে।

বাবার চাকরি পরিবর্তন হওয়ায় ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে আমাদের কলোনি ছেড়ে চলে আসতে হয়। এরপর জীবনের অসংখ্য বাঁক পেরোতে হয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই শুনছি, কলোনি নাকি আর আগের মতো নেই। সব আবাসিক ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে।

(বাঁ থেকে) লেখক, সুলতানা জেসমিন, নাজমুস সিয়াম চৌধুরী, মো. আতাউল করিম ভূঁইয়া (শামীম) ও সানজিদা বেগম
(বাঁ থেকে) লেখক, সুলতানা জেসমিন, নাজমুস সিয়াম চৌধুরী, মো. আতাউল করিম ভূঁইয়া (শামীম) ও সানজিদা বেগম

প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর এবার সুযোগ হলো বাল্যকালের সেই সময়টাতে ফেরার। ছোটবেলার বন্ধু সানজিদা এখন প্রাণ ডেইরির অ্যাসিস্টেন্ট জেনারেল ম্যানেজার। ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশন থেকে সার কারখানা যাওয়ার পথে তার কর্মক্ষেত্র। স্টেশনের অন্য পাশে প্রাণ-আরএফএল পাবলিক স্কুলের পেছনে তার কোয়ার্টার। গেস্ট হাউসের ব্যবস্থাও রয়েছে। সেখানে সানজিদা আর শামীম ভাইয়ের রাজকীয় আপ্যায়ন কোনোদিন ভুলবো না। স্ত্রী-পুত্রসহ রাতটা গেস্ট হাউসে কাটিয়ে পরদিন কলোনিতে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা হলো। যাত্রা আরামদায়ক করতে তারা শীতল গাড়ির ব্যবস্থাও করেছে।

এখনও অক্ষত ডি-টাইপের সেই ভবন। ছবি: লেখক
এখনও অক্ষত ডি-টাইপের সেই ভবন। ছবি: লেখক

কলোনিতে গিয়ে দেখি, কোনো কিছুই আর আগের মতো নেই। মনো হলো কোনো ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে এসে পড়েছি। ভবনগুলো ভেঙে ফেলার পর আবার নতুন কাঠামোতে গড়ে তোলা হচ্ছে। অনেক রাস্তাও ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে সব পথ তো আমার চেনা। ছোটবেলার স্মৃতির ওপর ভরসা করে এগিয়ে যাই ডি-টাইপের সেই তিনতলা বিল্ডিংয়ের দিকে, যার পাশে ছিল একটি তালগাছ।

দূর থেকেই দেখা গেল, আমরা যেখানে থাকতাম সেই বিল্ডিংটি এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছে। হয়তো আমার জন্যই এতদিন সে অপেক্ষা করে ছিল।

ছোটবেলার বাসভবনের সামনে সস্ত্রীক লেখক
ছোটবেলার বাসভবনের সামনে সস্ত্রীক লেখক

বাস্তবতা এই যে, ভাঙা আর গড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় সভ্যতা। সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন নতুন রূপে ফিরে আসবে সার কারখানার এই কলোনি। নতুন প্রজন্মের কোলাহলে আবার মুখরিত হবে এই প্রাঙ্গণ। তবে আমার মতো আরও অনেকের মনের আকাশে তখনো ভেসে বেড়াবে সত্তর দশকের সেই সোনালী অতীত।

/এফসি/