শিরোনাম

মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্যের পদত্যাগ, দিলেন খোলাচিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক
মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্যের পদত্যাগ, দিলেন খোলাচিঠি
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর পদত্যাগ করেছেন কমিশনের সদস্যরা। সোমবার (১৩ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো একটি খোলাচিঠিতে তার এই অধ্যাদেশ বাতিলে নতুন সরকারের বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বিদায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিস।

গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত, বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ পুনরায় চালু হলো।

খোলা চিঠিতে সদ্যবিদায়ী কমিশন বলেছে, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা বারবার জানতে চাইছেন– ‘এখন আমাদের কী হবে?’ তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই চিঠি প্রকাশ করা হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, আমরা ৫ জন সদ্যবিদায়ী মানবাধিকার কমিশনার। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আমাদের কর্মজীবন মানবাধিকার সুরক্ষায় নিবেদিত ছিল। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার দরুন, ভুক্তভোগীদের বেদনা, আইন প্রয়োগকারীদের দৈনন্দিন প্রতিকূলতা এবং আইনাঙ্গনের জটিলতার সঙ্গে আমরা সুপরিচিত। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।

চিঠির তিনটি অংশ– সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব, অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তি চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা।

সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব

চিঠিতে বলা হয়, অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে সংসদে বেশ কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে মূল আইন উল্লেখ করে বলা হয়, এর ওপর ভিত্তি করেই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছিল। ফলে আলোচ্য তিনটি অধ্যাদেশ পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

প্রথমত, সংসদে বলা হয়েছে গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর।

বাস্তবে, অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ও জরিমানার বিধান রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের পদ্ধতি নেই, এমন দাবি করা হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন না দিলে শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। বরং পুনর্বহালকৃত ২০০৯ সালের আইনে এসব বিষয় অনুপস্থিত।

তৃতীয়ত, সংসদে বলা হয়েছে আইসিটি আইনই যথেষ্ট এবং গুম অধ্যাদেশ আইসিটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

কমিশনাররা বলেন, আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার করতে পারে; বিচ্ছিন্ন গুমের বিচার এর আওতায় পড়ে না। গুম অধ্যাদেশে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুমের বিচার আইসিটির এখতিয়ারেই রাখা হয়েছিল। ফলে দুই আইনের মধ্যে সাংঘর্ষিকতার প্রশ্ন ওঠে না।

চিঠিতে আরও বলা হয়, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার ফলে ১১ এপ্রিলের পর সংঘটিত নতুন কোনো গুম ফৌজদারি আইনে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকছে না, ফলে ভুক্তভোগীরা কার্যকর প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

সংসদে জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও কমিশনাররা বলেন, অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাজনৈতিক প্রতিরোধে সংঘটিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সুরক্ষা থাকলেও বিশৃঙ্খলার সুযোগে সংঘটিত হত্যার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রয়োজন ছিল, যা মানবাধিকার কমিশন করতো। কিন্তু পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের নেই।

তারা বলেন, কমিশন তদন্ত করে আবার নিজেই বাদী হওয়া পক্ষপাতমূলক, এমন অভিযোগও সঠিক নয়। তদন্তকারী পুলিশও নিয়মিত বাদী হয়, কিন্তু বিচারকের ভূমিকা পালন করে না; কমিশনের ক্ষেত্রেও একই কাঠামো প্রযোজ্য ছিল।

এছাড়া ২০০৯ ও ২০২৫ আইনকে সমান স্বায়ত্তশাসিত বলা হলেও বাস্তবে ২০০৯ আইনে কমিশনের কার্যকর তদন্তক্ষমতা সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়।

সরকারের প্রকৃত আপত্তি

সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে কমিশনাররা বলেন, সরকারের আপত্তির মূল লক্ষ্য ছিল কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা সীমিত করা।

প্রথমত, কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীন রাখার প্রস্তাব কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পরিপন্থি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, অডিটর জেনারেল ও নাগরিক সমাজের কাছে জবাবদিহি করতো। কিন্তু ২০০৯ আইনে কমিশন কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে গেছে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির দাবি। কমিশনারদের মতে, সরকারি বাহিনী অভিযুক্ত হলে সরকারের অনুমতিক্রমে তদন্ত কার্যকর হতে পারে না।

তৃতীয়ত, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩(২)-এর সঙ্গে অসঙ্গত। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা হলে সেটি গুম নয়, এ বিধান এরইমধ্যে সংবিধানেই নির্ধারিত।

চতুর্থত, বাছাই কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ফলে কমিশনার নিয়োগে দলীয়করণের ঝুঁকি বাড়বে।

ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান নিয়ে প্রস্তাবনা

খোলা চিঠিতে বলা হয়, সরকারের বক্তব্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে শক্তিশালী আইন তৈরির কথা বলা হচ্ছে, অপরদিকে বিশেষ কমিটিতে উত্থাপিত আপত্তিগুলো মানলে আইন অনিবার্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।

কমিশনাররা বলেন, অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে ৬০০-এর বেশি অংশীজন পরামর্শ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারাও ছিলেন। অধ্যাদেশ বাতিল না করেও তা সংশোধনের সুযোগ ছিল।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গুমবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ আইসিপিপিইডি-তে স্বাক্ষরের কারণে রাষ্ট্র গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য। ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার আইনকে শক্তিশালী করছে, নাকি দুর্বল করছে— সেদিকেই ভুক্তভোগীদের নজর থাকবে।

/এফসি/