পর্ব-১
রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পর্যটন শহর কক্সবাজার

রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পর্যটন শহর কক্সবাজার
আয়নাল হোসেন

বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। পাহাড়-সাগরের মিতালির অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসে দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। কিন্তু মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচলে দেশের বৃহত্তম এই পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ নজরদারি নেই। এ ছাড়া আশ্রয়শিবিরের বাইরে অবাধ যাতায়াতের সুযোগে রোহিঙ্গারা মিশে যাচ্ছে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। পরিচয় নিশ্চিত করার কোনো কড়াকড়ি ব্যবস্থা না থাকায় মাদক ব্যবসা, ডাকাতি, মানবপাচার ও খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অনেক রোহিঙ্গা। ঘটছে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়েরও ঘটনা। এসব অপরাধের ঘটনা সরাসরি কক্সবাজারের পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কে বাঙালি, কে রোহিঙ্গা চেনার উপায় নেই
সম্প্রতি টেকনাফ ও উখিয়ার কয়েটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ঘুরে দেখা গেছে, ক্যাম্পে প্রবেশ কিংবা বের হওয়ার সময় কাউকেই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না। এমনকি কোনো পরিচয়পত্র দেখানোরও প্রয়োজন পড়ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত আট বছরে অধিকাংশ রোহিঙ্গা বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষা রপ্ত করে ফেলেছে। ফলে তারা অনায়াসেই পরিচয় গোপন করে কক্সবাজার হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি অবৈধ উপায়ে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ এন.এম. সাজেদুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। রোহিঙ্গাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে টাকা, স্বর্ণালংকারসহ অনেক মূল্যবান সামগ্রী খোয়াচ্ছেন পর্যটকেরা।
মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলো দিন দিন যেন অপরাধের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে সাড়ে ১২ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে।
রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে আছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এই বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচবছরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অন্তত ২৪০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে । বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও খুনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ।
পাঁচ বছরের খুনের পরিসংখ্যান
২০২০ সালে এপিবিএনের তিনটি ব্যাটালিয়ন (৮, ১৪ ও ১) দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ক্যাম্পগুলোতে খুনের ঘটনার বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী ২০২০ সালে ১১টি হত্যাকাণ্ড, ২০২১ সালে ৩৩, ২০২২ সালে ৩৩, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৭৪, ২০২৪ সালে ৬২ এবং ২০২৫ সালে ২২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ।
২০২৬ সালের শুরুতেই উত্তাপ
চলতি বছরের শুরু থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত সময়ের হিসাব অনুযায়ী, রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খুনের ধারা অব্যাহত রয়েছে । বছরের প্রথম দুই মাসেই মোট ছয়জন খুন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৬ এপিবিএন এলাকায় ২টি এবং ৮, ১৪, ১৬ এপিবিএন ও ৯ এপিবিএন (ভাসানচর) এলাকায় ১টি করে মোট ৪টি খুনের ঘটনা ঘটে ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ এবং ২০২৪ সাল ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। যদিও ২০২৫ সালে খুনের সংখ্যা কিছুটা কমেছে, কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতেই ভাসানচরসহ বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে পুনরায় খুনের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। আশ্রয়শিবিরগুলোতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদক চোরাচালান এসব হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বাহিনীগুলো অপরাধ দমনে তৎপর থাকলেও দুর্গম পাহাড় ও ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আশ্রয়শিবিরগুলোতে নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৭২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কাঁটাতারের নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই বেষ্টনীর অর্ধেকই নষ্ট হয়ে গেছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২১ কিলোমিটার বেষ্টনী এখন ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক (এফডিএমএন) বিষয়ক পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) প্রলয় চিসিম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওয়ান-টু-ওয়ান চেক করা সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নষ্ট হয়ে গেছে। এই সুযোগে দুষ্কৃতিকারীরা অপরাধ করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেষ্টনী সংস্কারের জন্য প্রায় ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।’
পর্যটন এলাকায় রোহিঙ্গাদের দাপট
স্থানীয় লোকজনের অভযোগ, রোহিঙ্গারা আশ্রয়শিবিরের বাইরে এসে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও টমটম চালাচ্ছে। কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনেও তাদের অবাধ আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, ‘রোহিঙ্গারা সোজা পথে না পারলেও বিকল্প পথে ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করছে। তাদের আটকে রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বর্তমানে নেই বললেই চলে।’
নিরাপত্তা বাহিনীর বক্তব্য
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এপিবিএন কাজ করছে। তবে আশ্রয়শিবিরের সীমানার বাইরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহল বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ৮, ১৪ এবং ১৬ এপিবিএন ক্যাম্প এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। তবে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব এবং সীমানা প্রাচীর না থাকায় রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
স্থানীয়রা মনে করেন, রোহিঙ্গারা এখন কেবল কক্সবাজারের আপদ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত পরিচয় নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী মেরামত করা না হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজার পর্যটন এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ কিনা– সে প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে থাকেন। তবে এই ক্যাম্পের বাইরে আসার সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) দেখে। তবে তারা সংখ্যায় অনেক। ক্যাম্প থেকে বাইরে অবাধে চলাচল করলে তখন পর্যটকদের সমস্যা হতে পারে। তবে পর্যটকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসন ও টুরিস্ট পুলিশ রয়েছে।’

বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। পাহাড়-সাগরের মিতালির অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসে দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। কিন্তু মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচলে দেশের বৃহত্তম এই পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ নজরদারি নেই। এ ছাড়া আশ্রয়শিবিরের বাইরে অবাধ যাতায়াতের সুযোগে রোহিঙ্গারা মিশে যাচ্ছে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। পরিচয় নিশ্চিত করার কোনো কড়াকড়ি ব্যবস্থা না থাকায় মাদক ব্যবসা, ডাকাতি, মানবপাচার ও খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অনেক রোহিঙ্গা। ঘটছে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়েরও ঘটনা। এসব অপরাধের ঘটনা সরাসরি কক্সবাজারের পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কে বাঙালি, কে রোহিঙ্গা চেনার উপায় নেই
সম্প্রতি টেকনাফ ও উখিয়ার কয়েটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ঘুরে দেখা গেছে, ক্যাম্পে প্রবেশ কিংবা বের হওয়ার সময় কাউকেই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না। এমনকি কোনো পরিচয়পত্র দেখানোরও প্রয়োজন পড়ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত আট বছরে অধিকাংশ রোহিঙ্গা বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষা রপ্ত করে ফেলেছে। ফলে তারা অনায়াসেই পরিচয় গোপন করে কক্সবাজার হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি অবৈধ উপায়ে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ এন.এম. সাজেদুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। রোহিঙ্গাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে টাকা, স্বর্ণালংকারসহ অনেক মূল্যবান সামগ্রী খোয়াচ্ছেন পর্যটকেরা।
মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলো দিন দিন যেন অপরাধের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে সাড়ে ১২ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে।
রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে আছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এই বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচবছরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অন্তত ২৪০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে । বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও খুনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ।
পাঁচ বছরের খুনের পরিসংখ্যান
২০২০ সালে এপিবিএনের তিনটি ব্যাটালিয়ন (৮, ১৪ ও ১) দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ক্যাম্পগুলোতে খুনের ঘটনার বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী ২০২০ সালে ১১টি হত্যাকাণ্ড, ২০২১ সালে ৩৩, ২০২২ সালে ৩৩, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৭৪, ২০২৪ সালে ৬২ এবং ২০২৫ সালে ২২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ।
২০২৬ সালের শুরুতেই উত্তাপ
চলতি বছরের শুরু থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত সময়ের হিসাব অনুযায়ী, রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খুনের ধারা অব্যাহত রয়েছে । বছরের প্রথম দুই মাসেই মোট ছয়জন খুন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৬ এপিবিএন এলাকায় ২টি এবং ৮, ১৪, ১৬ এপিবিএন ও ৯ এপিবিএন (ভাসানচর) এলাকায় ১টি করে মোট ৪টি খুনের ঘটনা ঘটে ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ এবং ২০২৪ সাল ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। যদিও ২০২৫ সালে খুনের সংখ্যা কিছুটা কমেছে, কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতেই ভাসানচরসহ বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে পুনরায় খুনের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। আশ্রয়শিবিরগুলোতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদক চোরাচালান এসব হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বাহিনীগুলো অপরাধ দমনে তৎপর থাকলেও দুর্গম পাহাড় ও ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আশ্রয়শিবিরগুলোতে নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৭২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কাঁটাতারের নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই বেষ্টনীর অর্ধেকই নষ্ট হয়ে গেছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২১ কিলোমিটার বেষ্টনী এখন ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক (এফডিএমএন) বিষয়ক পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) প্রলয় চিসিম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওয়ান-টু-ওয়ান চেক করা সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নষ্ট হয়ে গেছে। এই সুযোগে দুষ্কৃতিকারীরা অপরাধ করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেষ্টনী সংস্কারের জন্য প্রায় ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।’
পর্যটন এলাকায় রোহিঙ্গাদের দাপট
স্থানীয় লোকজনের অভযোগ, রোহিঙ্গারা আশ্রয়শিবিরের বাইরে এসে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও টমটম চালাচ্ছে। কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনেও তাদের অবাধ আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, ‘রোহিঙ্গারা সোজা পথে না পারলেও বিকল্প পথে ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করছে। তাদের আটকে রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বর্তমানে নেই বললেই চলে।’
নিরাপত্তা বাহিনীর বক্তব্য
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এপিবিএন কাজ করছে। তবে আশ্রয়শিবিরের সীমানার বাইরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহল বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ৮, ১৪ এবং ১৬ এপিবিএন ক্যাম্প এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। তবে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব এবং সীমানা প্রাচীর না থাকায় রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
স্থানীয়রা মনে করেন, রোহিঙ্গারা এখন কেবল কক্সবাজারের আপদ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত পরিচয় নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী মেরামত করা না হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজার পর্যটন এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ কিনা– সে প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে থাকেন। তবে এই ক্যাম্পের বাইরে আসার সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) দেখে। তবে তারা সংখ্যায় অনেক। ক্যাম্প থেকে বাইরে অবাধে চলাচল করলে তখন পর্যটকদের সমস্যা হতে পারে। তবে পর্যটকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসন ও টুরিস্ট পুলিশ রয়েছে।’

রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পর্যটন শহর কক্সবাজার
আয়নাল হোসেন

বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। পাহাড়-সাগরের মিতালির অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসে দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। কিন্তু মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচলে দেশের বৃহত্তম এই পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ নজরদারি নেই। এ ছাড়া আশ্রয়শিবিরের বাইরে অবাধ যাতায়াতের সুযোগে রোহিঙ্গারা মিশে যাচ্ছে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। পরিচয় নিশ্চিত করার কোনো কড়াকড়ি ব্যবস্থা না থাকায় মাদক ব্যবসা, ডাকাতি, মানবপাচার ও খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অনেক রোহিঙ্গা। ঘটছে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়েরও ঘটনা। এসব অপরাধের ঘটনা সরাসরি কক্সবাজারের পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কে বাঙালি, কে রোহিঙ্গা চেনার উপায় নেই
সম্প্রতি টেকনাফ ও উখিয়ার কয়েটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ঘুরে দেখা গেছে, ক্যাম্পে প্রবেশ কিংবা বের হওয়ার সময় কাউকেই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না। এমনকি কোনো পরিচয়পত্র দেখানোরও প্রয়োজন পড়ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত আট বছরে অধিকাংশ রোহিঙ্গা বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষা রপ্ত করে ফেলেছে। ফলে তারা অনায়াসেই পরিচয় গোপন করে কক্সবাজার হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি অবৈধ উপায়ে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ এন.এম. সাজেদুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। রোহিঙ্গাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে টাকা, স্বর্ণালংকারসহ অনেক মূল্যবান সামগ্রী খোয়াচ্ছেন পর্যটকেরা।
মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলো দিন দিন যেন অপরাধের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে সাড়ে ১২ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে।
রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে আছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এই বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচবছরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অন্তত ২৪০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে । বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও খুনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ।
পাঁচ বছরের খুনের পরিসংখ্যান
২০২০ সালে এপিবিএনের তিনটি ব্যাটালিয়ন (৮, ১৪ ও ১) দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ক্যাম্পগুলোতে খুনের ঘটনার বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী ২০২০ সালে ১১টি হত্যাকাণ্ড, ২০২১ সালে ৩৩, ২০২২ সালে ৩৩, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৭৪, ২০২৪ সালে ৬২ এবং ২০২৫ সালে ২২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ।
২০২৬ সালের শুরুতেই উত্তাপ
চলতি বছরের শুরু থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত সময়ের হিসাব অনুযায়ী, রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খুনের ধারা অব্যাহত রয়েছে । বছরের প্রথম দুই মাসেই মোট ছয়জন খুন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৬ এপিবিএন এলাকায় ২টি এবং ৮, ১৪, ১৬ এপিবিএন ও ৯ এপিবিএন (ভাসানচর) এলাকায় ১টি করে মোট ৪টি খুনের ঘটনা ঘটে ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ এবং ২০২৪ সাল ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। যদিও ২০২৫ সালে খুনের সংখ্যা কিছুটা কমেছে, কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতেই ভাসানচরসহ বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে পুনরায় খুনের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। আশ্রয়শিবিরগুলোতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদক চোরাচালান এসব হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বাহিনীগুলো অপরাধ দমনে তৎপর থাকলেও দুর্গম পাহাড় ও ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আশ্রয়শিবিরগুলোতে নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৭২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কাঁটাতারের নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই বেষ্টনীর অর্ধেকই নষ্ট হয়ে গেছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২১ কিলোমিটার বেষ্টনী এখন ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক (এফডিএমএন) বিষয়ক পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) প্রলয় চিসিম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওয়ান-টু-ওয়ান চেক করা সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নষ্ট হয়ে গেছে। এই সুযোগে দুষ্কৃতিকারীরা অপরাধ করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেষ্টনী সংস্কারের জন্য প্রায় ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।’
পর্যটন এলাকায় রোহিঙ্গাদের দাপট
স্থানীয় লোকজনের অভযোগ, রোহিঙ্গারা আশ্রয়শিবিরের বাইরে এসে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও টমটম চালাচ্ছে। কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনেও তাদের অবাধ আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, ‘রোহিঙ্গারা সোজা পথে না পারলেও বিকল্প পথে ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করছে। তাদের আটকে রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বর্তমানে নেই বললেই চলে।’
নিরাপত্তা বাহিনীর বক্তব্য
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এপিবিএন কাজ করছে। তবে আশ্রয়শিবিরের সীমানার বাইরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহল বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ৮, ১৪ এবং ১৬ এপিবিএন ক্যাম্প এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। তবে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব এবং সীমানা প্রাচীর না থাকায় রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
স্থানীয়রা মনে করেন, রোহিঙ্গারা এখন কেবল কক্সবাজারের আপদ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত পরিচয় নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী মেরামত করা না হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজার পর্যটন এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ কিনা– সে প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে থাকেন। তবে এই ক্যাম্পের বাইরে আসার সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) দেখে। তবে তারা সংখ্যায় অনেক। ক্যাম্প থেকে বাইরে অবাধে চলাচল করলে তখন পর্যটকদের সমস্যা হতে পারে। তবে পর্যটকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসন ও টুরিস্ট পুলিশ রয়েছে।’




