সংসদ ভবনে মাইক কাণ্ডে জড়িতদের খুঁজছে দুদক

সংসদ ভবনে মাইক কাণ্ডে জড়িতদের খুঁজছে দুদক
মরিয়ম সেঁজুতি

জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে স্থাপিত অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ছয় প্রকৌশলীর জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের আত্মীয় পরিচয়ে জাহিদুর রহিম জোয়ারদার এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’ সংসদ ভবন ও স্বাস্থ্য খাতে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। জাহিদুর রহিমের এই লুটপাটের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অসাধু প্রকৌশলীরা।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত গণপূর্তের ইলেক্ট্রো মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম ও মাহাবুবুল হক চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী শমীরণ মিস্ত্রি ও আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদকে তলব করা হচ্ছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে চেষ্টা করেও গণপূর্তের ই/এম বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শমীরণ মিস্ত্রীর মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি ২০২২ সালে সেখানে ছিলাম। প্রায় দেড় বছর আগেই চলে এসেছি।’ দুদক তদন্ত শেষ করলে বলতে পারবে, আমি এ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কিনা। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তিন বছর চালিয়ে এসেছি। তখন কোনো সমস্যা হয়নি। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংসদ ভবনে ভাঙচুর চালানো হয়। দুদক থেকে আগে ভালোভাবে যাচাই- বাছাই করে দেখুক।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-৭ থেকে শমীরণ মিস্ত্রীকে পিএন্ডডি বিভাগ-১ এ বদলি করা হয়।
- সংসদের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনার কাজে গণপূর্তের একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
- ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’-এর মাধ্যমে শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ
- পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে প্রায় ৯ কোটি টাকার ভুয়া প্রাক্কলন তৈরির অভিযোগ
- পুরোনো সিস্টেম বাতিলের সিদ্ধান্ত—নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসাতে ফের বড় ব্যয়ের প্রস্তুতি
এর আগে দীর্ঘ ৭ বছর গণপূর্তের সবচেয়ে সম্মানজনক বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন শমীরণ মিস্ত্রী। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদকে ব্যবহার করে একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিন থেকেই সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটি নিয়ে খোদ স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের ক্ষোভের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সাউন্ড সিস্টেমের সমস্যার কারণে ওই দিন ৪০ মিনিটের জন্য সংসদ মুলতবি করা হয়। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে পুরো সাউন্ড সিস্টেম পরিবর্তন এবং এর সংস্কারকাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিও অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত গণপূর্তের (ই/এম) -৭ নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে অন্যত্র বদলি করার পর জড়িত আরও একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত থাকা আশ্রাফুল হক, আবুল কালাম, মাহাবুবুল হক চৌধুরী, শমীরণ মিস্ত্রী, আনোয়ার হোসেন ও আসিফ রহমান নাহিদকে তলব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনার কাজে অনিয়ম এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কারে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে চলতি বছরের জানুয়ারিতেই অনুসন্ধানে নামে দুদক। সম্প্রতি সেই অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে গণপূর্তকে একটি চিঠি দিয়ে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে নথিপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দুদক।
ওই চিঠিতে ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’-এর সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি গণপূর্ত অধিদপ্তর দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করবে, যাতে অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।’
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে স্থাপিত এসআইএস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিস্টেমটি পুনরায় চালু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে গণপূর্ত অধিদপ্তর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়। এ প্রেক্ষিতে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদার সংশ্লিষ্ট সিস্টেম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা মেরামতের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা সম্ভব বলে মতামত দেন এবং একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করে জমা দেন।
পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া ও সম্মানী ভাতা বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা চেয়ে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে আবেদন করে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, ‘জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলে স্থাপিত ‘শিওর’ ব্র্যান্ডের এসআইএস সিস্টেমের সমমানে বৈশিষ্ট্যের পণ্য বর্তমানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি না করলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা এ অনিয়মে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের যোগসাজশে পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে বলে দুদক উল্লেখ করেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, এসআইএস সিস্টেমের মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় ৯ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য দুদক চলতি বছরের ১৬ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে তাগিদপত্র পাঠায়। তবে কোনো সাড়া না পাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল প্রধান প্রকৌশলীর কাছে ‘বিষয়টি অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে পৃথক তাগিদপত্র পাঠানো হয়।
আত্মীয়তার জোরে একচ্ছত্র আধিপত্য
দুদকের অনুসন্ধান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা এবং সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী) ক্যাশিয়ার পরিচয়ে জাহিদুর রহিম জোয়ারদার গণপূর্ত অধিদপ্তরে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রতিযোগিতা ছাড়াই একের পর এক বড় বড় কাজ বাগিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার দাপটে তিনি স্বাস্থ্যখাতে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনার নামেও শত শত কোটি টাকা ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন।
পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে ৯ কোটি টাকার ‘ফাঁদ’
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংসদ ভবনের এসআইএস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জাহিদুর রহিম ও গণপূর্তের কিছু অসাধু কর্মকর্তা যোগসাজশ করে ‘শিওর’ ব্র্যান্ডের একটি পুরোনো ও অপ্রচলিত সিস্টেম মেরামতের নামে ৯ কোটি ৩ লাখ টাকার একটি ভুয়া প্রাক্কলন তৈরি করেন। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড ওই ধরনের সরঞ্জাম বর্তমানে উৎপাদনই করে না।
এর আগে, শুধু প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া এবং ‘সম্মানী ভাতা’ বাবদ গণপূর্তের কাছে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করে বিল জমা দেওয়া হয়, যা নজিরবিহীন।
তৎপর দুদক: নথিপত্র তলব
এসব অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে নেমেছে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম এই অনুসন্ধান চালাচ্ছে। জানা গেছে, সংসদ ভবনের বিগত কয়েক বছরের টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল-ভাউচার এবং কার্যাদেশের সমস্ত নথিপত্র তলব করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
দুদকের একটি সূত্র জানায়, জাহিদুর রহিমের বিরুদ্ধে শুধু সংসদ ভবন নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটায় সিন্ডিকেট করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের শঙ্কা
এই চক্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ অর্থ পাচারের। ভুয়া বিল ও মালামালের অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে এই চক্র কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত বড় বড় কর্মকর্তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
জাতীয় সংসদের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে এমন ভয়াবহ অনিয়ম নিয়ে এখন দেশজুড়ে আলোচনা চলছে।
পুরোনো পাল্টে নতুন সাউন্ড সিস্টেম
জানা গেছে, বারবার বিভ্রাট ও কয়েক দফা অধিবেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসদ কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম পুরোটাই পাল্টে নতুন করে বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের ৪ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। বাজেট অধিবেশনের আগেই আগামী মে মাসে নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসানোর প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানান, সাউন্ড সিস্টেমসহ এসআইএস নতুন করে বসাতে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ হতো। তবে বাজেট স্বল্পতার কারণে এটা নতুন না বসিয়ে সংস্কার করতে মাত্র ৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সংস্কারের এই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল সংসদ ভবন এলাকার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজকে।
তবে আমানত এন্টারপ্রাইজ নিজে না করে কাজটি এসআইএসের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিটিএলকে দিয়ে করিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। এ ছাড়া স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের বাসভবনের যেসব কাজ হয়েছে তা আমানত এন্টারপ্রাইজের নামে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও ওই প্রতিষ্ঠান সেসব কাজ করেনি। প্রায় তিন কোটি টাকার কাজ হয়েছে দেখানো হলেও দরপত্রের বিবরণ অনুযায়ী কাজ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে স্থাপিত অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ছয় প্রকৌশলীর জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের আত্মীয় পরিচয়ে জাহিদুর রহিম জোয়ারদার এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’ সংসদ ভবন ও স্বাস্থ্য খাতে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। জাহিদুর রহিমের এই লুটপাটের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অসাধু প্রকৌশলীরা।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত গণপূর্তের ইলেক্ট্রো মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম ও মাহাবুবুল হক চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী শমীরণ মিস্ত্রি ও আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদকে তলব করা হচ্ছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে চেষ্টা করেও গণপূর্তের ই/এম বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শমীরণ মিস্ত্রীর মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি ২০২২ সালে সেখানে ছিলাম। প্রায় দেড় বছর আগেই চলে এসেছি।’ দুদক তদন্ত শেষ করলে বলতে পারবে, আমি এ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কিনা। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তিন বছর চালিয়ে এসেছি। তখন কোনো সমস্যা হয়নি। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংসদ ভবনে ভাঙচুর চালানো হয়। দুদক থেকে আগে ভালোভাবে যাচাই- বাছাই করে দেখুক।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-৭ থেকে শমীরণ মিস্ত্রীকে পিএন্ডডি বিভাগ-১ এ বদলি করা হয়।
- সংসদের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনার কাজে গণপূর্তের একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
- ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’-এর মাধ্যমে শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ
- পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে প্রায় ৯ কোটি টাকার ভুয়া প্রাক্কলন তৈরির অভিযোগ
- পুরোনো সিস্টেম বাতিলের সিদ্ধান্ত—নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসাতে ফের বড় ব্যয়ের প্রস্তুতি
এর আগে দীর্ঘ ৭ বছর গণপূর্তের সবচেয়ে সম্মানজনক বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন শমীরণ মিস্ত্রী। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদকে ব্যবহার করে একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিন থেকেই সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটি নিয়ে খোদ স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের ক্ষোভের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সাউন্ড সিস্টেমের সমস্যার কারণে ওই দিন ৪০ মিনিটের জন্য সংসদ মুলতবি করা হয়। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে পুরো সাউন্ড সিস্টেম পরিবর্তন এবং এর সংস্কারকাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিও অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত গণপূর্তের (ই/এম) -৭ নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে অন্যত্র বদলি করার পর জড়িত আরও একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত থাকা আশ্রাফুল হক, আবুল কালাম, মাহাবুবুল হক চৌধুরী, শমীরণ মিস্ত্রী, আনোয়ার হোসেন ও আসিফ রহমান নাহিদকে তলব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনার কাজে অনিয়ম এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কারে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে চলতি বছরের জানুয়ারিতেই অনুসন্ধানে নামে দুদক। সম্প্রতি সেই অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে গণপূর্তকে একটি চিঠি দিয়ে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে নথিপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দুদক।
ওই চিঠিতে ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’-এর সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি গণপূর্ত অধিদপ্তর দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করবে, যাতে অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।’
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে স্থাপিত এসআইএস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিস্টেমটি পুনরায় চালু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে গণপূর্ত অধিদপ্তর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়। এ প্রেক্ষিতে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদার সংশ্লিষ্ট সিস্টেম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা মেরামতের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা সম্ভব বলে মতামত দেন এবং একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করে জমা দেন।
পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া ও সম্মানী ভাতা বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা চেয়ে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে আবেদন করে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, ‘জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলে স্থাপিত ‘শিওর’ ব্র্যান্ডের এসআইএস সিস্টেমের সমমানে বৈশিষ্ট্যের পণ্য বর্তমানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি না করলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা এ অনিয়মে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের যোগসাজশে পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে বলে দুদক উল্লেখ করেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, এসআইএস সিস্টেমের মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় ৯ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য দুদক চলতি বছরের ১৬ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে তাগিদপত্র পাঠায়। তবে কোনো সাড়া না পাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল প্রধান প্রকৌশলীর কাছে ‘বিষয়টি অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে পৃথক তাগিদপত্র পাঠানো হয়।
আত্মীয়তার জোরে একচ্ছত্র আধিপত্য
দুদকের অনুসন্ধান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা এবং সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী) ক্যাশিয়ার পরিচয়ে জাহিদুর রহিম জোয়ারদার গণপূর্ত অধিদপ্তরে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রতিযোগিতা ছাড়াই একের পর এক বড় বড় কাজ বাগিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার দাপটে তিনি স্বাস্থ্যখাতে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনার নামেও শত শত কোটি টাকা ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন।
পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে ৯ কোটি টাকার ‘ফাঁদ’
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংসদ ভবনের এসআইএস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জাহিদুর রহিম ও গণপূর্তের কিছু অসাধু কর্মকর্তা যোগসাজশ করে ‘শিওর’ ব্র্যান্ডের একটি পুরোনো ও অপ্রচলিত সিস্টেম মেরামতের নামে ৯ কোটি ৩ লাখ টাকার একটি ভুয়া প্রাক্কলন তৈরি করেন। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড ওই ধরনের সরঞ্জাম বর্তমানে উৎপাদনই করে না।
এর আগে, শুধু প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া এবং ‘সম্মানী ভাতা’ বাবদ গণপূর্তের কাছে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করে বিল জমা দেওয়া হয়, যা নজিরবিহীন।
তৎপর দুদক: নথিপত্র তলব
এসব অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে নেমেছে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম এই অনুসন্ধান চালাচ্ছে। জানা গেছে, সংসদ ভবনের বিগত কয়েক বছরের টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল-ভাউচার এবং কার্যাদেশের সমস্ত নথিপত্র তলব করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
দুদকের একটি সূত্র জানায়, জাহিদুর রহিমের বিরুদ্ধে শুধু সংসদ ভবন নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটায় সিন্ডিকেট করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের শঙ্কা
এই চক্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ অর্থ পাচারের। ভুয়া বিল ও মালামালের অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে এই চক্র কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত বড় বড় কর্মকর্তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
জাতীয় সংসদের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে এমন ভয়াবহ অনিয়ম নিয়ে এখন দেশজুড়ে আলোচনা চলছে।
পুরোনো পাল্টে নতুন সাউন্ড সিস্টেম
জানা গেছে, বারবার বিভ্রাট ও কয়েক দফা অধিবেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসদ কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম পুরোটাই পাল্টে নতুন করে বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের ৪ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। বাজেট অধিবেশনের আগেই আগামী মে মাসে নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসানোর প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানান, সাউন্ড সিস্টেমসহ এসআইএস নতুন করে বসাতে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ হতো। তবে বাজেট স্বল্পতার কারণে এটা নতুন না বসিয়ে সংস্কার করতে মাত্র ৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সংস্কারের এই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল সংসদ ভবন এলাকার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজকে।
তবে আমানত এন্টারপ্রাইজ নিজে না করে কাজটি এসআইএসের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিটিএলকে দিয়ে করিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। এ ছাড়া স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের বাসভবনের যেসব কাজ হয়েছে তা আমানত এন্টারপ্রাইজের নামে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও ওই প্রতিষ্ঠান সেসব কাজ করেনি। প্রায় তিন কোটি টাকার কাজ হয়েছে দেখানো হলেও দরপত্রের বিবরণ অনুযায়ী কাজ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংসদ ভবনে মাইক কাণ্ডে জড়িতদের খুঁজছে দুদক
মরিয়ম সেঁজুতি

জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে স্থাপিত অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ছয় প্রকৌশলীর জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের আত্মীয় পরিচয়ে জাহিদুর রহিম জোয়ারদার এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’ সংসদ ভবন ও স্বাস্থ্য খাতে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। জাহিদুর রহিমের এই লুটপাটের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অসাধু প্রকৌশলীরা।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত গণপূর্তের ইলেক্ট্রো মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম ও মাহাবুবুল হক চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী শমীরণ মিস্ত্রি ও আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদকে তলব করা হচ্ছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে চেষ্টা করেও গণপূর্তের ই/এম বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শমীরণ মিস্ত্রীর মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি ২০২২ সালে সেখানে ছিলাম। প্রায় দেড় বছর আগেই চলে এসেছি।’ দুদক তদন্ত শেষ করলে বলতে পারবে, আমি এ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কিনা। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তিন বছর চালিয়ে এসেছি। তখন কোনো সমস্যা হয়নি। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংসদ ভবনে ভাঙচুর চালানো হয়। দুদক থেকে আগে ভালোভাবে যাচাই- বাছাই করে দেখুক।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-৭ থেকে শমীরণ মিস্ত্রীকে পিএন্ডডি বিভাগ-১ এ বদলি করা হয়।
- সংসদের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনার কাজে গণপূর্তের একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
- ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’-এর মাধ্যমে শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ
- পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে প্রায় ৯ কোটি টাকার ভুয়া প্রাক্কলন তৈরির অভিযোগ
- পুরোনো সিস্টেম বাতিলের সিদ্ধান্ত—নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসাতে ফের বড় ব্যয়ের প্রস্তুতি
এর আগে দীর্ঘ ৭ বছর গণপূর্তের সবচেয়ে সম্মানজনক বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন শমীরণ মিস্ত্রী। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদকে ব্যবহার করে একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিন থেকেই সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটি নিয়ে খোদ স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের ক্ষোভের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সাউন্ড সিস্টেমের সমস্যার কারণে ওই দিন ৪০ মিনিটের জন্য সংসদ মুলতবি করা হয়। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে পুরো সাউন্ড সিস্টেম পরিবর্তন এবং এর সংস্কারকাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিও অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত গণপূর্তের (ই/এম) -৭ নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে অন্যত্র বদলি করার পর জড়িত আরও একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত থাকা আশ্রাফুল হক, আবুল কালাম, মাহাবুবুল হক চৌধুরী, শমীরণ মিস্ত্রী, আনোয়ার হোসেন ও আসিফ রহমান নাহিদকে তলব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাপনার কাজে অনিয়ম এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কারে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে চলতি বছরের জানুয়ারিতেই অনুসন্ধানে নামে দুদক। সম্প্রতি সেই অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে গণপূর্তকে একটি চিঠি দিয়ে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে নথিপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দুদক।
ওই চিঠিতে ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’-এর সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি গণপূর্ত অধিদপ্তর দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করবে, যাতে অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।’
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে স্থাপিত এসআইএস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিস্টেমটি পুনরায় চালু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে গণপূর্ত অধিদপ্তর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়। এ প্রেক্ষিতে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদার সংশ্লিষ্ট সিস্টেম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা মেরামতের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা সম্ভব বলে মতামত দেন এবং একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করে জমা দেন।
পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া ও সম্মানী ভাতা বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা চেয়ে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে আবেদন করে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, ‘জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলে স্থাপিত ‘শিওর’ ব্র্যান্ডের এসআইএস সিস্টেমের সমমানে বৈশিষ্ট্যের পণ্য বর্তমানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি না করলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা এ অনিয়মে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের যোগসাজশে পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে বলে দুদক উল্লেখ করেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, এসআইএস সিস্টেমের মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় ৯ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য দুদক চলতি বছরের ১৬ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে তাগিদপত্র পাঠায়। তবে কোনো সাড়া না পাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল প্রধান প্রকৌশলীর কাছে ‘বিষয়টি অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে পৃথক তাগিদপত্র পাঠানো হয়।
আত্মীয়তার জোরে একচ্ছত্র আধিপত্য
দুদকের অনুসন্ধান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা এবং সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী) ক্যাশিয়ার পরিচয়ে জাহিদুর রহিম জোয়ারদার গণপূর্ত অধিদপ্তরে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রতিযোগিতা ছাড়াই একের পর এক বড় বড় কাজ বাগিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার দাপটে তিনি স্বাস্থ্যখাতে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনার নামেও শত শত কোটি টাকা ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন।
পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে ৯ কোটি টাকার ‘ফাঁদ’
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংসদ ভবনের এসআইএস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জাহিদুর রহিম ও গণপূর্তের কিছু অসাধু কর্মকর্তা যোগসাজশ করে ‘শিওর’ ব্র্যান্ডের একটি পুরোনো ও অপ্রচলিত সিস্টেম মেরামতের নামে ৯ কোটি ৩ লাখ টাকার একটি ভুয়া প্রাক্কলন তৈরি করেন। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড ওই ধরনের সরঞ্জাম বর্তমানে উৎপাদনই করে না।
এর আগে, শুধু প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া এবং ‘সম্মানী ভাতা’ বাবদ গণপূর্তের কাছে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করে বিল জমা দেওয়া হয়, যা নজিরবিহীন।
তৎপর দুদক: নথিপত্র তলব
এসব অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে নেমেছে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম এই অনুসন্ধান চালাচ্ছে। জানা গেছে, সংসদ ভবনের বিগত কয়েক বছরের টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল-ভাউচার এবং কার্যাদেশের সমস্ত নথিপত্র তলব করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
দুদকের একটি সূত্র জানায়, জাহিদুর রহিমের বিরুদ্ধে শুধু সংসদ ভবন নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটায় সিন্ডিকেট করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের শঙ্কা
এই চক্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ অর্থ পাচারের। ভুয়া বিল ও মালামালের অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে এই চক্র কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত বড় বড় কর্মকর্তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
জাতীয় সংসদের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে এমন ভয়াবহ অনিয়ম নিয়ে এখন দেশজুড়ে আলোচনা চলছে।
পুরোনো পাল্টে নতুন সাউন্ড সিস্টেম
জানা গেছে, বারবার বিভ্রাট ও কয়েক দফা অধিবেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসদ কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম পুরোটাই পাল্টে নতুন করে বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের ৪ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। বাজেট অধিবেশনের আগেই আগামী মে মাসে নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসানোর প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানান, সাউন্ড সিস্টেমসহ এসআইএস নতুন করে বসাতে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ হতো। তবে বাজেট স্বল্পতার কারণে এটা নতুন না বসিয়ে সংস্কার করতে মাত্র ৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সংস্কারের এই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল সংসদ ভবন এলাকার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজকে।
তবে আমানত এন্টারপ্রাইজ নিজে না করে কাজটি এসআইএসের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিটিএলকে দিয়ে করিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। এ ছাড়া স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের বাসভবনের যেসব কাজ হয়েছে তা আমানত এন্টারপ্রাইজের নামে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও ওই প্রতিষ্ঠান সেসব কাজ করেনি। প্রায় তিন কোটি টাকার কাজ হয়েছে দেখানো হলেও দরপত্রের বিবরণ অনুযায়ী কাজ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।




