শিরোনাম

দুপুরে হঠাৎ থেমে যায় স্পেন, এই নীরবতার আড়ালে কী রহস্য?

নিজস্ব প্রতিবেদক
দুপুরে হঠাৎ থেমে যায় স্পেন, এই নীরবতার আড়ালে কী রহস্য?
স্পেনের পাম্পলোনায় সান ফের্মিন রানিং অফ দ্য বুলস উৎসবের চতুর্থ দিনে, অংশগ্রহণকারীরা ক্লান্তি কাটাতে বিকালে সিয়েস্তা নিচ্ছেন। ছবি: বিবিসি

দুপুর গড়াতে না গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্য। ব্যস্ত রাস্তা ফাঁকা হতে থাকে ধীরে ধীরে। একে একে নামতে থাকে দোকানের শাটার। ছোট রেস্তোরাঁ, পারিবারিক ব্যবসা, এমনকি কিছু অফিসও বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমবার দেখলে মনে হতে পারে শহরটি যেন হঠাৎ থেমে গেছে। কিন্তু এই থেমে যাওয়া কোনো অস্বাভাবিকতা নয়। এটি স্পেনের বহু পুরোনো এক জীবনধারা, যার নাম সিয়েস্তা।

স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে দুপুরের এই বিশ্রাম নেওয়ার অভ্যাস বহু শতাব্দী ধরে চলে আসছে। সাধারণত দুপুর দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সময়কে সিয়েস্তার সময় হিসেবে ধরা হয়। এই সময় মানুষ কাজ থামিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। কেউ মধ্যাহ্নভোজ সেরে নেয়। কেউ অল্প সময়ের জন্য ঘুমায়। আবার কেউ শুধু শরীরটাকে বিশ্রাম দেয়। এরপর বিকাল বা সন্ধ্যায় নতুন উদ্যমে আবার কাজ শুরু হয়।

তবে এই সংস্কৃতির পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতা। স্পেনের আবহাওয়া বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে বেশ উষ্ণ হয়। দিনের মাঝামাঝি সময়ে তাপমাত্রা থাকে অনেক বেশি। এমন গরমে কাজ করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাই দিনের সবচেয়ে গরম সময়টুকু এড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়ার এই অভ্যাস গড়ে ওঠে। এতে শরীরও সুস্থ থাকে, কাজের দক্ষতাও বাড়ে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, কৃষিনির্ভর জীবনব্যবস্থার সঙ্গে এই অভ্যাসের যোগসূত্র রয়েছে। একসময় ভোরে কৃষকরা মাঠে কাজ শুরু করতেন। দুপুরের তীব্র রোদে কাজ বন্ধ রেখে কিছু সময় বিশ্রাম নিতেন। পরে বিকালে আবার কাজে ফিরতেন। সময়ের সঙ্গে পেশা বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু সেই অভ্যাসের ছাপ এখনো রয়ে গেছে।

তবে আধুনিক স্পেনে সিয়েস্তার চিত্র একরকম নয়। বড় শহরগুলোতে এই অভ্যাস অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন মাদ্রিদ বা বার্সিলোনা শহরে অধিকাংশ অফিস ও বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন সারাদিন খোলা থাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন এবং করপোরেট সংস্কৃতির প্রভাবে কাজের সময়সূচিতে এসেছে বড় পরিবর্তন।

কাজের ফাঁকে রাস্তার পাশেই সিয়েস্তা নিচ্ছেন এক লোক। ছবি: সংগৃহীত
কাজের ফাঁকে রাস্তার পাশেই সিয়েস্তা নিচ্ছেন এক লোক। ছবি: সংগৃহীত

তবুও ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে সিয়েস্তা এখনো জীবনের স্বাভাবিক অংশ। স্থানীয় দোকান, বাজার এবং পারিবারিক ব্যবসাগুলো দুপুরে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। অনেকের কাছে এটি শুধু বিশ্রামের সময় নয়, বরং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর একটি সুযোগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প সময়ের দুপুরের বিশ্রাম শরীর ও মনের জন্য উপকারী হতে পারে। এতে ক্লান্তি কমে, মনোযোগ বাড়ে এবং কাজের প্রতি আগ্রহও ফিরে আসে। তবে দীর্ঘ সময় ঘুমালে উল্টো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই সিয়েস্তা সাধারণত সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম হিসেবেই কার্যকর।

অন্যদিকে সমালোচনাও কম নয়। কেউ কেউ মনে করেন, দিনের মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি কাজের গতি কমিয়ে দেয়। অফিসের সময় দীর্ঘ হয়। অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হতে রাত হয়ে যায়। এতে ব্যক্তিগত জীবন ব্যাহত হতে পারে।

এই বাস্তবতায় স্পেনে কাজের সময়সূচি পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন সময়। উদ্দেশ্য ছিল কাজ ও জীবনের মধ্যে আরও ভালো ভারসাম্য তৈরি করা। যদিও পুরো দেশে একযোগে বড় কোনো পরিবর্তন এখনো কার্যকর হয়নি।

সবকিছুর পরও সিয়েস্তা শুধু একটি অভ্যাস নয়, বরং স্পেনের সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।

/এসএ/