শিরোনাম

আবু সাঈদ হত্যা মামলা: কোন আসামি কী সাজা পেলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
আবু সাঈদ হত্যা মামলা: কোন আসামি কী সাজা পেলেন
রায় ঘোষণাকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিত্র। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে দুই আসমির মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন এবং বাকি ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

২ পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড

রায়ে মামলার দুই আসামি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

৩ জনের যাবজ্জীবন

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিও পুলিশ সদস্য। তারা হলেন- সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।

সাবেক উপাচার্যসহ ৩ শিক্ষকের ১০ বছরের কারাদণ্ড

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো.মশিউর রহমান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডলকেও একই সাজা দেওয়া হয়েছে। তারা তিনজনই পলাতক।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম ও সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেলকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা দুজন গ্রেপ্তার রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমান ও সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, সাবেক এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল, সাবেক নিরাপত্তা প্রহরী নুর আলম মিয়া, সাবেক এমএলএসএস এ কে এম আমির হোসেনকে ৩ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই পলাতক।

ট্রাইব্যুনাল থেকে এক আসামিকে বের করা হচ্ছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
ট্রাইব্যুনাল থেকে এক আসামিকে বের করা হচ্ছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মাহাবুবার রহমানকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তিনি পলাতক রয়েছেন।

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজকেও দোষী সাব্যস্ত করেছে ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায়ে বলা হয়েছে, তার হাজতবাসকালীন সময়কে সাজার মেয়াদ গণ্য করে দণ্ডাদেশ প্রদান করা হলো। অন্য কোনো মামলায় প্রয়োজন না হলে তার সাজার মেয়াদ সমাপ্ত হয়েছে বিবেচনায় তাকে অবিলম্বে মুক্তি প্রদানের জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা হলো।

৩ পুলিশ কর্মকর্তার সশ্রম কারাদণ্ড

শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন আদালত। এর মধ্যে আরপিএমপির সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে ১০ বছর এবং সাবেক উপকমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেন ও সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শাহ নূর আলম পাটোয়ারীকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা তিনজনই পলাতক।

এদিকে, এই মামলার আসামি চিকিৎসক মো. সরোয়ার হোসেনকে (চন্দন) ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনিও পলাতক রয়েছে।

৮ ছাত্রলীগ নেতার বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড

রায়ে মামলার আসামি ও রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ৮ নেতাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদুল হাসানকে ৫ বছর এবং সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাফুজুর রহমান, সহসভাপতি মো. ফজলে রাব্বি, মো. আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ, ধনঞ্জয় কুমার ও দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেনকে ৩ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই পলাতক।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ।

দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া সাঈদের সেই ভিডিওটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপরই ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যার ফলশ্রুতিতে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি শহীদ আবু সাঈদের পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন। পরে ওই বছরের ২৪ জুন তদন্ত সংস্থা ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেটি ৩০ জুন আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

এই মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ মোট আসামি ৩০ জন। তাদের মধ্যে সাবেক উপাচার্যসহ ২৪ জনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। বাকি ৬ আসামি কারাগারে ছিলেন।

বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার সময় মামলার ৬ আসামি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক সাবেক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

/এফআর/